ধসে পড়ার ঝুঁকিতে জেটি

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সঙ্গে কুতুবদিয়ার লোকজনের বঙ্গোপসাগর পারাপারের একমাত্র মাধ্যম হলো মগনামা টার্মিনাল জেটিঘাট। এ ঘাট থেকে কুতুবদিয়ার হযরত মালেক শাহ (র.)-এর মাজারসহ ৫টি পয়েন্টে এবং কক্সবাজার ফিশারিঘাট, মহেশখালীসহ বিভিন্ন স্থানে যাওয়া যায়। বঙ্গোপসাগরে আহরিত মাছ বিক্রির জন্যও প্রসিদ্ধ এ ঘাটটি। তা ছাড়াও কুতুবদিয়া চ্যানেলের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য প্রতিদিন এ ঘাটে ভিড় জমায় শত শত পর্যটক।

জানা যায়, ২০০৫ সালের ১২ আগস্ট মগনামা জেটিঘাটের নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পেকুয়া উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এ ঘাটটি নির্মাণ করার পরে কক্সবাজার জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর করেন। এরপর থেকেই ঘাটটির বার্ষিক ইজারা নিয়ন্ত্রণ করেন কক্সবাজার জেলা পরিষদ।

স্থানীয়রা জানান, জেটিঘাটটি কক্সবাজার জেলা পরিষদ বার্ষিক ইজারা দিয়ে কোটি টাকা আদায় করলেও দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এর কোনো সংস্কার নেই। এর ফলে বর্তমানে ঘাটটির এমন করুণ দশা হয়েছে যে, যেকোনো মুহূর্তে তা ভেঙে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে ঘাটের পিলার ও রেলিংয়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।

তথ্যসূত্র জানায়, মগনামা জেটিঘাটটির ইজারা দুই ভাগে বিভক্ত। জেটিঘাটের ইজারা দেয় কক্সবাজার জেলা পরিষদ। আর পারাপারের ইজারা দেয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। আবার জেলা প্রশাসক ইজারা দেয় ২ ভাগে। একটি হচ্ছে মগনামা টু বড়ঘোপ টার্মিনাল জেটিঘাট, আরেকটি হচ্ছে মগনামা টু দরবার লঞ্চঘাট। অপরদিকে কুতুবদিয়া প্রান্তে রয়েছে ৫টি জেটিঘাট। সেগুলো হচ্ছে, দরবার লঞ্চঘাট, বড়ঘোপ টার্মিনাল জেটিঘাট, সাত্তার উদ্দিন টার্মিনাল জেটিঘাট, আলী আকবর ডেইল জেটিঘাট ও আকবর বলি জেটিঘাট।

কক্সবাজার জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে মগনামা জেটিঘাটটি ১ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মগনামা টার্মিনাল জেটিঘাট হতে বড়ঘোপ টার্মিনাল জেটিঘাট পারাপারের ইজারা দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ৯৪ লাখ টাকায়। আর মগনামা হতে দরবার লঞ্চ ঘাটটি একই দপ্তর থেকে পারাপারের ইজারা দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকায়। একইভাবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে দরবার লঞ্চঘাটটি ইজারা দেওয়া হয় ৭৫ লাখ টাকায় এবং আলী আকবর ডেইল জেটিঘাটটি ইজারা দেওয়া হয় ১২ লাখ টাকায়। বিআইডব্লিউটিএ বড়ঘোপ টার্মিনাল জেটিঘাট ইজারা দেয় ১ কোটি ২০ লাখ টাকায়। একই দপ্তর থেকে সাত্তার উদ্দিন টার্মিনাল জেটিঘাট ১৬ লাখ টাকায় এবং আকবর বলি ঘাট ইজারা দেওয়া হয় ৫ লাখ টাকায়। অপরদিকে কুতুবদিয়ার সাত্তার উদ্দিন টার্মিনাল জেটিঘাট থেকে ছনুয়া জেটিঘাটের ইজারা দেওয়া চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তর থেকে। সব মিলিয়ে হিসাব করলে সরকার বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে এসব জেটিঘাট থেকে বার্ষিক রাজস্ব পায় প্রায় ৮ কোটি টাকা।

পারাপারের ইজারাদারের অধীনে মগনামা জেটিঘাট হতে বড়ঘোপ যাতায়াতের জন্য রয়েছে ৭টি স্পিড বোট আর লোকাল ডেনিস বোট রয়েছে ৫টি। স্পিড বোটের ভাড়া রাখা হয় জনপ্রতি ৮০ টাকা এবং ডেনিস বোটে ভাড়া রাখা হয় ৩০ টাকা। এর বাইরে মালামালের টাকা গুনতে হয় আলাদা। তবে নৌকায় ওঠার আগে ঘাটের ইজারাদারকে জনপ্রতি গুনতে হয় ৫ টাকা। একইভাবে মগনামা হতে দরবার লঞ্চঘাটে চলাচল করে ৫টি ডেনিস বোট ও ৫টি স্পিড বোট। এ রুটেও যাত্রীদের ভাড়া গুনতে হয় একই।

মগনামা জেটিঘাট থেকে বড়ঘোপ ঘাটে সি-ট্রাক সংযোগ করায় যাত্রী সেবায় কিছুটা স্বস্তি এলেও তাতে উঠতে মূল জেটি এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আলী আকবর ডেইল জেটিঘাট ইতিমধ্যে ভেঙে বিলীন হয়ে গেছে। বড়ঘোপ জেটিঘাটটিও নানা সমস্যায় জর্জরিত। এসব ঘাট দিয়ে যাত্রীদের পারাপারে প্রতিনিয়ত অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে যাত্রীরা পারাপার করতে গিয়ে নানা প্রকার দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মগনামা ঘাটের জেটির পিলার, রেলিং, পাটাতন জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। ঘাটের দুপাশে নৌযান ভেড়ানো জন্য নির্মিত ২টি সিঁড়ি মূল পাটাতন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইজারাদার গাছের তক্তা দিয়ে কোনোরকম মেরামত করে যাত্রী ও মালামাল ওঠানামা করাচ্ছে।

মগনামা জেটিঘাটের ইজারাদার নুরুল ইসলাম বলেন, ‘শিগগিরই জেটিঘাট সংস্কারের ব্যবস্থা করা না হলে যেকোনো সময় জেটিটি অচল হয়ে পারাপার বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’

মগনামা জেটিঘাট সংস্কারের বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান মাহবুব বলেন, ‘জেলা পরিষদের সচিবের নেতৃত্বে একটি টিম পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করেছেন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মহোদয়ও পরিদর্শন করে গেছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে বরাদ্দ ছাড় নিয়ে সংস্কারকাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’