অপরাধ দমনের নামে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে ভয়াবহ ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ চিত্র সামনে এসেছে। গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র আট মাসে পুলিশের নবগঠিত বিশেষ ইউনিট ‘ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট’ (সিসিডি)-এর হাতে অন্তত ৯২৪ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তান (এইচআরসিপি)-এর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি একে ‘পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
গত নভেম্বরের এক রাতে দক্ষিণ পাঞ্জাবের বাহাওয়ালপুর শহরে জুবাইদা বিবির বাড়িতে হানা দেয় সিসিডি-র সশস্ত্র সদস্যরা। তারা ঘর থেকে নগদ টাকা, গয়না, এমনকি মেয়ের বিয়ের যৌতুক পর্যন্ত লুটে নেয়। ধরে নিয়ে যায় জুবাইদার তিন ছেলে—ইমরান (২৫), ইরফান (২৩), আদনান (১৮) এবং তার দুই জামাতাকে। জুবাইদা বিবি জানান, তিনি সন্তানদের মুক্তির জন্য পুলিশের পিছু পিছু লাহোর পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু পরের দিন সকালেই খবর আসে, পৃথক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তাদের পাঁচজনই মারা গেছেন। পরে মামলা করতে চাইলে পুলিশ হুমকি দেয়, মামলা না তুললে পরিবারের বাকিদেরও মেরে ফেলা হবে। নিহতদের বাবার দাবি, তার ছেলেদের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না; তারা সবাই শ্রমজীবী মানুষ ছিলেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফ ‘সেফ পাঞ্জাব’ ভিশন নিয়ে সিসিডি গঠন করেন। এর লক্ষ্য ছিল সংগঠিত অপরাধ এবং আন্তঃজেলা গ্যাং দমন করা। কিন্তু এইচআরসিপি-র প্রতিবেদনে একে একটি ‘সমান্তরাল পুলিশ বাহিনী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যারা আইনের তোয়াক্কা না করে অবাধে মানুষ হত্যা করছে।
এইচআরসিপি-র তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৬৭০টি ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটেছে। এতে ৯২৪ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়েছেন। এর বিপরীতে মাত্র ২ জন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ৩৬ জন আহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে পুরো পাকিস্তানজুড়ে যেখানে বন্দুকযুদ্ধে ৩৪১ জন নিহত হয়েছিল, সেখানে সিসিডি মাত্র আট মাসেই সেই সংখ্যাকে দ্বিগুণের বেশি ছাড়িয়ে গেছে।
এইচআরসিপি লক্ষ্য করেছে, পুলিশের করা প্রায় প্রতিটি প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর) একই ছকে লেখা। সাধারণত বলা হয়—গভীর রাতে মোটরসাইকেলে থাকা সন্দেহভাজনদের থামতে বললে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে তারা আহত হয় এবং সহযোগীরা অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পালিয়ে যায়। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, অনেক এফআইআরে দাবি করা হয়েছে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সন্দেহভাজনরা মরার ঠিক আগে পুলিশের কাছে তাদের পূর্ণ নাম, ঠিকানা এবং অপরাধের কথা স্বীকার করে গেছেন। মানবাধিকার সংস্থাটি একে ‘কপি-পেস্ট’ বা সাজানো বয়ান বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে লাহোরে (১৩৯টি বন্দুকযুদ্ধ)। এরপর ফয়সালাবাদে ৫৫টি এবং শেখুপুর জেলায় ৪৭টি ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে বড় অংশই ডাকাতি (৩৬৬ জন), মাদক (১১৪ জন), ছিনতাই (১৩৮ জন) এবং হত্যা মামলার (৯৯ জন) আসামি ছিলেন বলে পুলিশ দাবি করেছে। এইচআরসিপি-র অভিযোগ, পরিবারগুলোকে স্বাধীন ময়নাতদন্ত ছাড়াই দ্রুত লাশ দাফন করতে বাধ্য করা হয়েছে।
পাঞ্জাব সরকারের দাবি, সিসিডি-র এই কড়া অবস্থানের কারণে রাজ্যে সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ ৬০ শতাংশ কমেছে। মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ বারবার দাবি করেছেন, পাঞ্জাব এখন নিরাপদ। সিসিডি বলছে, তারা ‘ইন্টেলিজেন্স ড্রিভেন পুলিশিং’ করছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, অপরাধ কমানোর জন্য ফরেনসিক তদন্ত বা বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন না করে সরকার এই অবৈধ ‘শর্টকাট’ বেছে নিয়েছে। সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক চাপের মুখে পুলিশ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দিকে ঝুঁকছে।
লাহোরভিত্তিক আইনজীবী রিদা হোসাইন বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত এই সহিংসতা ঔপনিবেশিক আমল ও সামরিক একনায়কতন্ত্রের প্রেতাত্মা। আজ যদি এই হত্যাকাণ্ডকে ‘জিরো ক্রাইম’ এর নামে জায়েজ করা হয়, তবে কাল রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীরাও এই সাজানো বন্দুকযুদ্ধের শিকার হতে পারে। এইচআরসিপি এই মুহূর্তে সিসিডি-র কার্যক্রম নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।’
সূত্র: আল-জাজিরা