ল্যানসেটের প্রতিবেদন

গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসনে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা পূর্বের সব সরকারি হিসাবকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকেই গাজায় ৭৫ হাজারের বেশি ‘সহিংস মৃত্যু’র ঘটনার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গবেষকরা বলছেন, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিহতের যে পরিসংখ্যান দিয়ে আসছে, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। মূলত ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মরদেহ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত ‘গাজা মর্টালিটি সার্ভে’ (জিএমএস) শীর্ষক এক জনমিতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত গাজায় অন্তত ৭৫ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি সরাসরি সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। এটি গাজার যুদ্ধের আগের মোট জনসংখ্যার (২২ লাখ) প্রায় ৩.৪ শতাংশ। এই সংখ্যাটি একই সময়ে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত পরিসংখ্যানের (৪৯,০৯০ জন) চেয়ে প্রায় ৩৪.৭ শতাংশ বেশি। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসনিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়ে যে অতিরঞ্জিত তথ্য দেয়নি, ধারাবাহিক এসব গবেষণা সেটিই স্পষ্ট করেছে। সেই সঙ্গে তা ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানির বিস্তৃতি নিয়ে শক্তপোক্ত ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭১ হাজার ৬৬২ জন। এর মধ্যে গত বছরের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত আরও ৪৮৮ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল শুরু থেকেই এই পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও, জানুয়ারিতে এক ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, সেনাবাহিনী গাজায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি মেনে নিয়েছে।

লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক মাইকেল স্পাগাট জানিয়েছেন, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য নির্ভরযোগ্য হলেও তা অত্যন্ত রক্ষণশীল। কারণ, মৃত্যু নথিবদ্ধ করার জন্য যে প্রশাসনিক অবকাঠামো প্রয়োজন, ইসরায়েলি হামলায় তা সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ফলে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু তালিকার বাইরে থেকে গেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নিহতদের মধ্যে ৫৬.২ শতাংশই নারী, শিশু ও বৃদ্ধযা ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত রিপোর্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ছাড়া সরাসরি হামলায় মৃত্যু ছাড়াও অবরোধ ও মানবেতর পরিস্থিতির কারণে আরও ১৬ হাজার ৩০০ জন ‘অ-সহিংস’ কারণে মারা গেছেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে সরাসরি চিকিৎসাসেবার অভাব এবং জীবনযাত্রার মান চরমভাবে নিচে নেমে যাওয়ার ফলে। গাজায় কেবল নিহতের সংখ্যাই বাড়ছে না, আহতদের অবস্থাও শোচনীয়। ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিন-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত গাজায় আহতের সংখ্যা ১ লাখ ১৬ হাজার ২০ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৯ হাজার থেকে ৪৬ হাজার মানুষের জটিল পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার দরকার।