অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তিগুলো সংসদে পর্যালোচনার দাবি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি ‘ভয়াবহ’ ও ‘দেশের স্বার্থবিরোধী’ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। এ চুক্তির শর্তগুলো অনেক কঠোর বলছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এ চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে ঝুঁকিতে ফেলছে। রাজনৈতিক ও আইনগতভাবেও বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ চুক্তিটি। তাই নতুন সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার মাধ্যমে পর্যালোচনার কথা বলছেন তার।

বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি এ চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু : অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘গত অন্তর্বর্তী সরকার যেসব ক্রয় চুক্তি করে গেছে, সেখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা পর্যালোচনা করে দেখা প্রয়োজন। গত সরকার বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক চুক্তিও করেছে। এসব বৈদেশিক চুক্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়নি বা শুধু বন্দর দিয়ে দেওয়ার জন্য হয়নি। অন্যান্য ক্ষেত্রেও হয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে হয়তো আমরা এখনো অবহিত না। এসব বৈদেশিক চুক্তিকে পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’

নতুন সরকারকে একটি উত্তরণকালীন দল গঠনের পরামর্শ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘এই দলের প্রাথমিক কাজ হবে গত আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ময়নাতদন্ত করে একটি দলিল বা ব্রিফিং ডকুমেন্ট তৈরি করা। সেটার ভিত্তিতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারবে।’

সরকারের একটা উত্তরণকালীন দল গঠন করার প্রস্তাব দিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আগের সরকার কী রেখে যাচ্ছে, কী দিয়ে যাচ্ছে, কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়বে, নতুন সরকারের কাছে চুক্তিগুলোর কী ধরনের দায়-দায়িত্ব বর্তায়, তা বোঝার জন্য এই দল স্বচ্ছতার সঙ্গে মূল্যায়ন কবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একটা ব্রিফিং ডকুমেন্টস করতে পারে দলটি।’

এআরটিকে ‘ভয়াবহ’ ও দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন অর্থনীতিবিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের কয়েক দিন আগে চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এখনো এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। যেসব দেশ করেছে, তাদের চুক্তির শর্ত বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালো।’

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ও বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এমন মন্তব্য করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে অন্তর্বর্তী সরকার তাড়াহুড়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) এই যে চুক্তিগুলো এভাবে করল, বাংলাদেশকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলল। ইচ্ছা করলেই বলতে পারত, নির্বাচিত সরকার আসছে, আপনারা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন।’

চুক্তির শর্তের কথা উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘সরকার দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করলে তৈরি পোশাক খাত শুল্কমুক্ত-সুবিধা পাবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেখানে এত শর্ত আর অনিশ্চয়তা রয়েছে যে বাস্তবে কোনো সুবিধা মিলবে কি না সেটা স্পষ্ট নয়। তুলার দাম বেশি হবে। রপ্তানির পরিমাণও নির্দিষ্ট করা নেই।’

বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, এ চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে বড় ধরনের সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রয়োজনে চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।

বিএনপি সরকারের প্রতি আনু মুহাম্মদের আহ্বান, ‘সবার আগে বাংলাদেশ তারেক রহমানের এই সেøাগান যদি সত্যি হয়, তারেক রহমান যদি এটা ‘সিরিয়াসলি মিন’ করে থাকেন, তাহলে প্রথম কাজ হলো, এই চুক্তিগুলো থেকে বাংলাদেশ কীভাবে মুক্তি পাবে, তার রাস্তা পরিষ্কার করা। এই চুক্তিগুলো যারা সম্পাদন করেছেন, তাদের জবাবদিহি ও বিচারের আওতায় আনা।’

আলোচনা সভায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তিকে ‘অসম ও ক্ষতিকর’ বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা। তিনি বলেন, এই চুক্তি দেশের জ¦ালানি নিরাপত্তা, শিল্পনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।’ তার মতে, চুক্তিতে এমন কিছু বাধ্যতামূলক শর্ত রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে।

চুক্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও কৃষি-শিল্প খাতে ভর্তুকি সীমিত করার শর্ত থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিল্পকে দাঁড় করাতে ভর্তুকি প্রয়োজন।’ চুক্তি বাতিল অথবা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদে আলোচনা করা আর জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল।

জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর আইনি ও নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। আলোচনায় তিনি বলেন, ‘এসব চুক্তির ধারাগুলো আনফেয়ার কন্ট্রাক্ট টার্মসের (অসম চুক্তি) উদাহরণ। চুক্তিগুলো শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও আইনগতভাবেও বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার মাধ্যমে এগুলো পর্যালোচনা করা এখন সময়ের দাবি। এসব চুক্তি নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ করা জরুরি।

এদিকে চুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলছের ব্যবসায়ীরা। ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তির প্রভাব’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রি (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে আমাদের দেশের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু কিছু চিন্তার বিষয়ও রয়েছে। যেমন চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কোনো বাংলাদেশি কোম্পানির রপ্তানি করা পণ্যের দাম সে দেশের বাজারে প্রচলিত মূল্য থেকে কম হলে যুক্তরাষ্ট্র ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কারণ, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করতে পারে।’

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘চুক্তিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) অন্য দেশের কোম্পানিগুলো একই ধরনের সুবিধা চাইতে পারে। সেটি আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এই চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত নীতিমালাগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমাদের অবস্থানকে সীমাবদ্ধ করে ফেলবে।’

অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিটি খুবই কঠোর শর্তভিত্তিক, যেখানে অনেক বেঁধে দেওয়া বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে হওয়া চুক্তিতে শর্তগুলো আরও নমনীয় দেখা গেছে। বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে পাঁচটি পরামর্শ দেন নাসিম মঞ্জুর। তিনি বলেন, ‘চুক্তিটি অবশ্যই সংসদে পর্যালোচনা সাপেক্ষে অনুসমর্থন করতে হবে। চুক্তি নিয়ে যথাযথ আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে আগাতে হবে। চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের ট্যারিফ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে সরকারে কোনো পরিবর্তন হয় কি না সেটি দেখা যেতে পারে। সর্বোপরি, আমরা চুক্তিটি আবার পর্যালোচনার কথা বলতে পারি।’