নিরাপত্তাই বড় চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারের

সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ইতিমধ্যে নতুন সরকারের একদিন পার হয়ে গেছে। প্রথম দিনেই ভিআইপি মুভমেন্টে যেন সাধারণ মানুষের যাতায়াতে ভোগান্তি না হয় সে বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজি) কড়া বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জননিরাপত্তা বিধান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঢেলে সাজানো, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার করা ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ফের আটক করা এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

নতুন সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল। কারণ মাঠপর্যায়ে ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণ, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও আশা-বাস্তবতার টানাপড়েন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। নতুন সরকারের জন্য শাসন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে অর্থনীতিও সচল হবে না। শিল্পকারখানা, বন্দর, পরিবহন প্রভৃতি নিরাপদ পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা চান। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করা ও অপরাধ দমনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতি একে অন্যের পরিপূরক। নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না, আবার অর্থনৈতিক স্বস্তি ছাড়া সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই দুই খাতে সমন্বিত ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা।’

তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নের জন্য পুলিশ বাড়ানো বা অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গোটা বিচারব্যবস্থার সমন্বিত সংস্কার। তদন্তের মান উন্নত না হলে, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে, অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে অপরাধ কমবে না। জনআস্থা ফেরাতে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা জরুরি।’

গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পুলিশকে জনগণের বন্ধু বানাতে হবে। নষ্ট ভাবমূর্তি ফেরাতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত বাহিনী গড়তে হবে। সবার গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা থাকতে হবে। তদবির চলবে না। বাহিনীর কেউ অপরাধে জড়ালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশে মব সংস্কৃতির অবশেষ রাখা যাবে না। দাবি-দাওয়া জানানোর সুযোগ সবাই পাবে। তবে সড়ক-মহাসড়ক আটকে দাবি আদায় চলবে না। এমন করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্তর্বর্তী সময়ে নাজুক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী : জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ১৮ মাসে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক ছিল বলে অভিযোগ অনেকের। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিক্ষোভ, ‘মব’ সহিংসতা, দখলদারি ও অবরোধের মতো ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও, রাস্তা অবরোধ ও সহিংসতা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। নতুন সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা তৈরি ও জনআস্থা অর্জন করা।

ক্ষমতার পালাবদলের পর স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত, দখল বা প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঝুঁকি আছেই। এমন পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে না পারলে তা বিস্তৃত অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ভোটের পর মুন্সীগঞ্জে সহিংস ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। বাগেরহাটেও একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সিলেট, কুমিল্লা, নরসিংদী, ফেনী, গাজীপুর, নাটোর, ঝালকাঠি, নড়াইল, পাবনা, বগুড়া, ফরিদপুর, বরগুনা, ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, পটুয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় হামলায় দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে চুরির মামলা হয়েছে ৯ হাজার ৬৭২টি, ছিনতাই ১ হাজার ৯৩৫টি এবং ডাকাতি ৭০২টি, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। ২০২৪ সালে যথাক্রমে ছিল ৮ হাজার ৬৫৫টি, ১ হাজার ৪১২টি ও ৪৯০টি। এ সময়ে হত্যা মামলার সংখ্যাও উদ্বেগজনক। গত পাঁচ বছরে ১৬ হাজার ৬৩১টি হত্যা মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৩ হাজার ৮৩৬টি মামলা হয়েছে ২০২৫ সালে। পাঁচ বছরে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণ-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাও ১ লাখ ২ হাজার ৮৪৫টি। ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৪৩১টি এবং ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি মামলা হয়েছে। নতুন সরকারকে এসব অপরাধ কমিয়ে আনতে হবে।

লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ফের আটক : অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দেওয়ার পরও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পর পুলিশের যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল সেগুলো উদ্ধার করা যায়নি। এখনো হদিস না পাওয়া এক হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গোলাবারুদ নিয়ে ভয়-আতঙ্ক রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশের ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুণ্ঠিত হয়। উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার ৪৩২টি। এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি ১ হাজার ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র। লুণ্ঠিত গোলাবারুদ ছিল ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি। এখনো উদ্ধার হয়নি ২ লাখের বেশি গোলাবারুদ।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কারাগার থেকে অনেক শীর্ষ সন্ত্রসী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। বিষয়টি নতুন সরকারের গলার কাটা হতে পারে। এদের ফের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নেওয়া নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নতুন সরকারের নতুন পরিকল্পনা রয়েছে। থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার ও জামিনে মুক্ত শীর্ষ সন্ত্রসীদের ফের গ্রেপ্তারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বাহিনীর সক্ষমতা ও সমন্বয় : আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রধান দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং অন্যান্য সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। মাঠপর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হতে পারে। পুলিশে কথা উঠেছে, পুলিশকে শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সংস্কারের বিকল্প নেই। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে বাহিনীর কর্মরতদের মধ্য থেকে আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ দেওয়া গেলে গতি আরও বাড়বে।

পুলিশকে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে : আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কমানো, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে জনআস্থা পুনর্গঠন।

চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা : দেশে দীর্ঘ একটি সময় একটি দল চাঁদাবাজি করে আসছিল। অন্তর্বর্তী সময়েও চাঁদাবাজির হার কমেনি। চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপির নেতাকর্মীদের বহিষ্কার করার ঘটনাও ঘটেছে। নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।

ভিআইপি মুভমেন্ট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা : নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার চলাচলের সময় সড়কে জনসাধারণের যাতায়াতে যেন দুর্ভোগ না হয় সে বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) বাহারুল আলমকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। আইজিপি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার চলাচলের কারণে যেন সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে না পড়ে সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। ট্রাফিক ব্যবস্থা যেন স্বাভাবিক থাকে, সে বিষয়ে তিনি আমাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন।’