ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাত

আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা কেমন? আমাদের খাদ্যের মান যেমন ঠিক, সম্ভবত সেই অনুপাতেই আছে স্বাস্থ্যসেবার মান। আমরা কোনো মার্কস দিতে পারব না, এর মান-এর। দূষিত বললে, যে রূপটি চোখে বা মনে জেগে ওঠে, খাদ্যদ্রব্য ও স্বাস্থ্যসেবার মানকে সে কাতারে ফেলা যায়। আর সেকারণেই শঙ্কা বেশি। সুচিকিৎসা বলে যে ধারণাটি আমাদের মধ্যে বেঁচে আছে, তা যে মৃত, সেটা আমরা বুঝি না, বুঝতে দেওয়া হয় না। চিকিৎসা পেয়ে যিনি সুস্থ হলেন, তার কাছে চিকিৎসা ও ডাক্তার উন্নত মানের। আর যারা সেরে ওঠেন না, তাদের কাছে চিকিৎসক ও চিকিৎসা সবচেয়ে খারাপ। ঠিক এই কথাগুলোই উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরের রিপোর্টে। সরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা পায় মাত্র ১৫ শতাংশ রোগী। বাকি ৮৫ শতাংশের ভরসা বেসরকারি হাসপাতাল। সেখানে ব্যয় এতটাই যে, সাধারণ ও মধ্যবিত্তের মানুষ তা কল্পনাও করতে পারেন না। চিকিৎসকের মান বিবেচনায় নিলে, সরকারি-বেসরকারি দুটোরই চিকিৎসামান এক। শুধু বিল্ডিংয়ের চাকচিক্য আর সেবা দেওয়ার আয়োজন ভিন্ন। কিন্তু টেকনিশিয়ানের যোগ্যতার তেমন কোনো হেরফের নেই। অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতালে, ডাক্তার আসেন সরকারি হাসপাতাল থেকে। আবার রোগী দেখার যে রীতি, সেখানেও সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারই উচ্চ ফি নিয়ে রোগীকে সেবা দেন। এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের।

এই পরিস্থিতির জন্য কে বা কারা দায়ী, তা কিন্তু বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী পুরোপুরিই জানেন। তিনি নিজেও একজন চিকিৎসক। ফলে চিকিৎসাক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী যে সেবা চলে না, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মন্ত্রী থেকে শুরু করে সচিব এবং নিচে একেবারে পিয়ন পর্যন্ত আর্থিক দুর্নীতির সুবিধাভোগী। কেনাকাটায় লুট হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। খালি বাক্স দিয়েও নিয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার বিল। মেশিন না লাগলেও কিনে তা রেখে দেওয়া হয় স্টোরে। নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা খাত। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে এখন আর কোনো সচ্ছল মানুষ দেশের কোনো সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে যেতে চান না। এই রকম একটি পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন জাহিদ হোসেন। কেনাকাটা, নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এই কয়টি ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতে বেশি দুর্নীতি হয়। এই সমস্যার টুঁটি চেপে ধরবেন কী করে, সেটা সবার আগে ভাবতে হবে। রোধ করতে হবে এই লুটেরা কাজ। কারা এই সবে জড়িত, জাহিদ হোসেন তা জানেন। কারা তদবিরে সুফল আনতে চান তাও তার নখদর্পণে। তবে, এবার ওই সব অনিয়ম দুর্নীতিতে সহযোগ দেবেন ড্যাবের ডাক্তাররা। তারা দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করবেন, তারাই ওই সব দুর্নীতির আশ্রয় নেবেন, নাকি স্বাস্থ্য খাতে যে অস্বাস্থ্যময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা অপসারণে যোগ্য ভূমিকা নেবেন?

জাতির কাছে দেওয়া তাদের নেতার ওয়াদা বাস্তব করে তুলতে হলে, দলীয় চিন্তার লেজুড়বৃত্তি পরিত্যাগ করতে হবে। এর অন্য বিকল্প নেই। কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি বলেছেন  স্বাস্থ্যসেবার মূল উদ্দেশ্য, মানুষের আয়ু বাড়ানো। সেটা তো হয় না। বিশেষ করে প্রান্তিক জনপদের স্বাস্থ্যসেবার দুরবস্থা এতটাই নাজুক যে, তার বর্ণনা জরুরি। যদি কেন্দ্র থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত সমানভাবে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যায়, তাহলে গণমানুষের বিশেষ উপকার হয়। সেটা নিশ্চিত করতে হলে, চিকিৎসকদের প্রান্তিক জনপদে থাকতে হবে। একইসঙ্গে তাদের বেতন নগর/রাজধানীতে যারা থাকবেন, তাদের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ গুণ বাড়ালে পরিস্থিতি অনুকূল হবে। সেটা ডাক্তার, নার্স, প্যারামেডিক্যালদের ক্ষেত্রে অনুসৃত হতে হবে। যিনি বা যারা মেশিন বাক্সবন্দি করে রেখেছেন, তাদের বিচারের আওতায় আনলেই, ভবিষ্যতে ওই পথে কেউ হাঁটবেন না। স্বাস্থ্য খাত পুনরুদ্ধারে নতুন সরকারকে সফল হতে হবেই।