পঞ্চমবারের মতো চীনের নিংশিয়া হুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গিয়ে অঞ্চলটিকে যেন নতুন চোখে দেখলাম। এবার একটি বিষয় আমার কাছে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল, ফুচিয়ান প্রদেশ ও নিংশিয়া হুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের মধ্যে তিন দশকের গড়া অংশীদারত্ব শুধু দারিদ্র্য দূর করার একটি কর্মসূচি নয়। এই কর্মসূচি দেখিয়েছে, সঠিক সহযোগিতা কীভাবে ভিন্নতাকে শক্তিতে পরিণত করতে পারে এবং একটি অঞ্চলের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। ২০২১ সালে প্রথমবার নিংশিয়ায় গিয়েছিলাম, সেই সময় ছিল ফুচিয়ান-নিংশিয়া সহযোগিতার ২৫ বছর পূর্তি। পাঁচ বছর পর আবার নিংশিয়া গিয়ে বুঝতে পারলাম, তিন দশকের এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অর্জন নতুন ভবন, সড়ক বা শিল্পপার্ক নয়। এর গভীরতর অর্জন হলো, এক সময় দারিদ্র্য ও প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থার কারণে সীমাবদ্ধ থাকা একটি অঞ্চলের মানুষ আজ নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য অনেক বেশি সুযোগ-সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফুচিয়ান-নিংশিয়া অংশীদারত্বের মূল শিক্ষা হলো, সহযোগিতা শুধু সম্পদ দেয় না, মানুষের সামনে নতুন বিকল্প তৈরি করে। ভিন্নতাকে দুর্বলতা না বানিয়ে সম্পদে পরিণত করে।
১৯৯৬ সালে চীনের পূর্ব-পশ্চিম সমন্বিত উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে এই অংশীদারত্ব শুরু হয়। তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ উপকূলীয় প্রদেশ ফুচিয়ানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় উত্তর-পশ্চিম চীনের স্থলবেষ্টিত দুর্গম পাহাড়ি মরুভূমি অঞ্চল নিংশিয়াকে। দুই অঞ্চলের মধ্যে ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক কাঠামো ও উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জের বড় পার্থক্য ছিল, কিন্তু তিন দশক পর সেই পার্থক্যই হয়ে উঠেছে সহযোগিতার ভিত্তি। শুরুতে যেখানে প্রধান লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য বিমোচন, সময়ের সঙ্গে তা বিস্তৃত হয়েছে শিল্প, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং বাজার সংযোগে। গত ৩০ বছরে ফুচিয়ান নিংশিয়ায় ৭৬৮ কোটি ইউয়ান সহায়তা দিয়েছে। ৪ হাজার ১০০টির বেশি সহযোগিতা প্রকল্পের মাধ্যমে নিংশিয়ার প্রায় ২৪ লাখ ৪০ হাজার মানুষ উপকৃত হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৬০টির বেশি প্রদর্শনীমূলক গ্রাম ও ৪২৩টি পুনর্বাসন কমিউনিটি। প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন। পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। তবে এখানেই গল্প শেষ হয়নি। বরং এখান থেকেই শুরু হয়েছে সহযোগিতার দ্বিতীয় অধ্যায়, যা সহায়তা থেকে অংশীদারত্বে উত্তরণ। ফুচিয়ান নিয়ে এসেছে পুঁজি, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও বাজারের সংযোগ। অন্যদিকে নিংশিয়া দিয়েছে ভূমি, সম্পদ এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ। শিল্প সহযোগিতা হলো এর মধ্যে অন্যতম বড় উদাহরণ। ফুচিয়ান ও নিংশিয়া যৌথভাবে ১২টি শিল্পপার্ক গড়ে তুলেছে। এসব শিল্পপার্কে প্রায় ৪০০টি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে এবং বার্ষিক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে।
মানুষ সেখানে শুধু উন্নয়নের সুবিধাভোগী নন; উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহক। একজন উদ্যোক্তা নতুন বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। ফলে মানুষের চলাচলও এক ধরনের উন্নয়ন অবকাঠামোতে পরিণত হয়। নিংশিয়ার আরেকটি উদাহরণ, প্রযুক্তি কীভাবে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাকেও বদলে দিতে পারে। সমুদ্র থেকে বহু দূরে অবস্থিত মরুভূমি বেষ্টিত অঞ্চল নিংশিয়ায় এখন সামুদ্রিক মাছ চাষ হচ্ছে। ২০২২ সালে ফুচিয়ানের বিশ্ববিদ্যালয় ও নিংশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় লবণাক্ত-ক্ষারীয় পানির পুকুরে সামুদ্রিক পানির অনুকরণে বড় আকারের ইয়েলো ক্রোকার মাছ চাষ সফল হয়। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পর অসম্ভব মনে হওয়া এই উদ্যোগ বাস্তবতায় রূপ নেয়। বর্তমানে নিংশিয়ায় বছরে ২ হাজার টনের বেশি সামুদ্রিক খাবার উৎপাদিত হচ্ছে। এর শিক্ষা শুধু মাছ চাষে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়নের জন্য সবসময় ভৌগোলিক অসুবিধা দূর করতে হয় না; অনেক সময় প্রযুক্তি সেই অসুবিধার সংজ্ঞাই বদলে দিতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রযুক্তি শুধু স্থানান্তর করলেই সাফল্য আসে না। স্থানীয় বাস্তবতা, পরিবেশ ও মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে প্রযুক্তিকে মানিয়ে নিতে হয়। তখনই প্রযুক্তি দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হয়। অবকাঠামো দ্রুত তৈরি করা যায়, কিন্তু দক্ষতা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সময় লাগে। গত তিন দশকে ফুচিয়ান শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৭ হাজারের বেশি পেশাজীবী ও প্রযুক্তিবিদ নিংশিয়ায় পাঠিয়েছে। দুই অঞ্চলের স্কুল ও হাসপাতালগুলোও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। স্বাস্থ্য খাতে ফুচিয়ান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অধিভুক্ত হাসপাতাল নিংশিয়ার ইউয়ানঝৌ জেলা পিপলস হাসপাতালে একাধিক দফায় চিকিৎসক পাঠিয়েছে। এই সহযোগিতার ফলে ৬৫টি ক্লিনিক্যাল প্রক্রিয়া মানসম্মত হয়েছে এবং নিংশিয়ার চিকিৎসকরাও ফুচিয়ানে উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন। এ ধরনের সহযোগিতা শুধু যন্ত্রপাতি পাঠানোর চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। যন্ত্র পুরনো হয়ে যেতে পারে, কিন্তু জ্ঞান ও দক্ষতা দীর্ঘদিন মূল্য সৃষ্টি করতে পারে। তাই উন্নয়ন সহযোগিতার প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত স্থায়ী নির্ভরতা তৈরি করা নয়। বরং এমন সক্ষমতা সৃষ্টি করা, যার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষ নিজেরাই দাঁড়াতে, প্রতিযোগিতা করতে এবং উদ্ভাবন করতে পারেন।
ফুচিয়ান-নিংশিয়া অংশীদারত্ব এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করেছে যার মাধ্যমে জ্ঞান, পুঁজি, প্রযুক্তি ও মানুষ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে প্রবাহিত হয়েছে এবং বৃহত্তর উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করেছে। এর বড় শক্তি সম্ভবত ধারাবাহিকতা। ৩০ বছর ধরে পারস্পরিক সুবিধা, পরিপূরক শক্তি, দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা ও অভিন্ন উন্নয়নের নীতিকে ধরে রেখে সম্পর্কটি সময়ের সঙ্গে বদলেছে। পুরনো সহায়তার কাঠামোয় আটকে না থেকে প্রতিটি পর্যায় আগের অর্জনের ওপর ভিত্তি করে নতুন পর্যায়ে এগিয়েছে। উন্নয়ন বৈষম্যে ভুগছে এমন দেশগুলোর জন্য এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। দরিদ্র অঞ্চলকে সমৃদ্ধ অঞ্চলের হুবহু অনুকরণ করতে হবে এমন নয়। প্রয়োজন এমন সম্পদ, প্রযুক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বাজারের সঙ্গে সংযোগ, যা স্থানীয় শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব উন্নয়নের পথ তৈরি করতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশের জন্য এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বাংলাদেশে জাতীয় অর্থনীতি এগোলেও অঞ্চলভেদে উন্নয়নের সুযোগ এখনো সমান নয়। রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে অনেক জেলা শিল্প, প্রযুক্তি, দক্ষতা, বিনিয়োগ ও বাজারের সুযোগ থেকে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে। এই বৈষম্য কমাতে শুধু কেন্দ্রীয় বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; বরং স্থানীয় সক্ষমতা তৈরির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
প্রথমত, বাংলাদেশের শিল্পসমৃদ্ধ জেলার সঙ্গে পিছিয়ে থাকা জেলার দীর্ঘমেয়াদি ‘টুইন পার্টনারশিপ’ গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও বাজার সংযোগে জেলা-জেলা সহযোগিতা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। দ্বিতীয়ত, অঞ্চলভেদে ভিন্ন উন্নয়ন কৌশল প্রয়োজন। উপকূলে মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতি, উত্তরাঞ্চলে কৃষি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হাওরে জলসম্পদভিত্তিক অর্থনীতি এবং পার্বত্য এলাকায় পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। সব অঞ্চলের জন্য এক মডেল কার্যকর নয়। তৃতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়নকে উন্নয়নের কেন্দ্রে আনতে হবে। কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা, ই-কমার্স, আধুনিক কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিল্প ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প ও সরকারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করে স্থানীয় সমস্যা সমাধানে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে কাজে লাগাতে হবে। চতুর্থত, চীনসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্কেও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শুধু অবকাঠামো, ঋণ বা বিনিয়োগ নয়, বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, স্থানীয় সরবরাহকারী তৈরি এবং বাজার সংযোগকে সহযোগিতার কেন্দ্রে আনতে হবে। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ। পঞ্চমত, চীনসহ বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্কেও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু অবকাঠামো, ঋণ বা বিনিয়োগের দিকে না তাকিয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা সহযোগিতা, স্থানীয় সরবরাহকারী তৈরি এবং বাজার সংযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশকে উন্নয়নকে আরও বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, কে কাকে কত সহায়তা দিচ্ছে, বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, সহযোগিতার মাধ্যমে কীভাবে প্রতিটি অঞ্চলকে আরও সক্ষম করে তোলা যায়। উন্নয়ন কোনো একমুখী সহায়তার গল্প নয়। এটি পারস্পরিক শেখা, সক্ষমতা তৈরি এবং সুযোগ ভাগ করে নেওয়ার প্রক্রিয়া। ফুচিয়ান শুধু নিংশিয়াকে সাহায্য করেনি; সময়ের সঙ্গে দুই অঞ্চল একে অপরকে এগিয়ে নেওয়ার পথ শিখেছে। বাংলাদেশের জন্যও তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সক্ষমতার ভিত্তি শক্ত করা, কেন্দ্রনির্ভরতা কমিয়ে আঞ্চলিক শক্তিকে কাজে লাগানো এবং বিনিয়োগকে জ্ঞান-প্রযুক্তি সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত করা। উন্নয়ন কোনো প্রতিযোগিতা নয়, যেখানে সব অঞ্চলকে একই পথে এগোতে হবে। উন্নয়ন হলো নিজেদের শক্তিকে চিহ্নিত করা, অন্যের শক্তির সঙ্গে যুক্ত করা এবং মানুষের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া।
লেখক : চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওভারসিজ এডুকেশনের সিনিয়র লেকচারার ও গবেষক। বাংলাদেশের ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বেল্ট অ্যান্ড রোড রিসার্চ সেন্টারের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো