ব্যবহারে সীমা রাখতে আইন প্রয়োজন

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৭ এএম

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং আইনমন্ত্রী বিচারাঙ্গনে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তারা যথার্থই অনুধাবন করেছেন, এআই কোথায় কতটা ব্যবহার করা যাবে, এ বিষয়ে আইন থাকা উচিত। অধুনা এআইয়ের বিপুল বিস্তৃতি এবং নিত্যব্যবহার, বিশেষত চ্যাটজিপিটির মতো জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সুনির্দিষ্টভাবে বললে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল অথবা এলএলএম চ্যাটবট বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সুতরাং এআইয়ের কার্যপদ্ধতি বা সীমাবদ্ধতা ভালোভাবে না জেনে যথেচ্ছ ব্যবহারে সীমারেখা টানার জন্য সুস্পষ্ট আইন প্রয়োজন। আইনের অনুপস্থিতিতে বা যতদিন পর্যন্ত আইন প্রণয়ন সম্ভব হচ্ছে না, ততদিন অন্তত এ বিষয়ক একটি স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। দেরিতে হলেও বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখন এ প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেমন জাতীয়ভাবে এআইয়ের ব্যবহার বিষয়ক একটি নীতিমালার খসড়া ইতিমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে, এখন যা চূড়ান্তকরণের অপেক্ষায় রয়েছে। অপরদিকে জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকও দাপ্তরিক কাজে, যথা : নোট লেখা, ডেটা বা তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রতিবেদন তৈরির মতো কাজের জন্য চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লড, গ্রোক, ডিপসিক প্রভৃতির ব্যবহার বিষয়ে সতর্ক করেছে।

কিন্তু  অন্যান্য সরকারি দপ্তর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের মতোই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিচার বিভাগ এবং স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতের জন্য অদ্যাবধি এআই ব্যবহার সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা প্রণয়ন হয়নি। সংসদ থেকে আইন পাস হওয়ার আগে বর্তমান শূন্যতা পূরণে প্রধান বিচারপতি উদ্যোগী হয়ে অন্তত বিচার বিভাগের জন্য  বিচারক, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী সাধারণ জনগণ, আদালতে কর্মরত স্টাফদের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারেন। বিশে^র অনেক দেশে সর্বোচ্চ আদালত কিংবা বিচার বিভাগীয় সংস্থা ইতিমধ্যে সেসব দেশের আদালতে এআই ব্যবহার করার জন্য বিচারক, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী জনতা, আদালতে কর্মরত কর্মীদের জন্য নীতিমালা তৈরি করেছেন। কিছু দেশে অবশ্য আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও আইনজীবীদের জন্য নীতিমালা তৈরি করে আইন পেশায় এআই ব্যবহারের পরিধি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।  যদিও এসব নীতিমালা কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে গবেষকদের প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো এ রকম কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অন্যান্য যেকোনো পেশার মতো আইন পেশায়ও এই উদীয়মান প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতে পারে।  কিন্তু কোথায়, কখন, কীভাবে, কতটুকু ব্যবহৃত হতে পারে সে সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনা থাকা জরুরি। সেই সঙ্গে আবশ্যক এই আধুনিক প্রযুক্তি উত্তমরূপে ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। আরও প্রয়োজন আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিচার বিভাগের জনবল দক্ষ করে গড়ে তোলা। কেবল প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়, বরং এআইয়ের নৈতিক, সামাজিক, বিচারিক, মনস্তাত্তিক বিবিধ আঙ্গিক থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার।

বাংলাদেশে বর্তমানে বলবৎ কোনো আইনে নির্দিষ্ট করে রায় লিখতে বা বিচার করতে এআইয়ের প্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়নি। কিন্তু তার মানে এই নয়, আধুনিক এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিচার করা বা রায় লেখা বেআইনি নয়। যতক্ষণ না বিদ্যমান আইন, সাংবিধানিক নীতি এবং প্রতিষ্ঠিত আইনি রীতি পরিবর্তন করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ কথা ধরে নেওয়া যায় যে, মানব বিচারকের মাধ্যমে বিচার পাওয়া মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারে মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্টভাবে সুপ্রিমকোর্ট প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এর বিচারকদের ওপর বিচারিক ক্ষমতা ন্যস্ত করেছে। অতএব, কেবল মানব বিচারকই আদালতে বিরোধ গ্রহণ, আইনের ব্যাখ্যা ও বলবতযোগ্য রায় ঘোষণা করতে পারেন। কোনো যন্ত্র বা এআইকে সে ক্ষমতা দিতে চাইলে নতুন আইন প্রণয়ন করে ক্ষমতা দিতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধান এবং বিচারব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এআইয়ের মাধ্যমে বিচার করা হলে বচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বা বলা যায় পরাস্ত হবে। তা ছাড়া এআইয়ের দ্বারা বিচার সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদানুসারে ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতিরও পরিপন্থী। স্যার এডওয়ার্ড কোকের সময় থেকে চলে আসা ‘কমন ল’ আইনের ঐতিহ্যে  ‘স্বাভাবিক যুক্তি’ এবং ‘কৃত্রিম যুক্তি’, যার অর্থ বিচারকদের ‘দীর্ঘ অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতার’ মাধ্যমে অর্জিত পরিশীলিত বিচারবুদ্ধির মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। তাই এই ‘কৃত্রিম যুক্তি’কে আইনি ঐতিহ্যের একটি অনন্য ও মানবিক ফসল হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি যেমনটি উল্লেখ করেছেন, বিচারকার্য পরিচালনার জন্য অপরিহার্য একজন বিচারকের বিবেক ও বুদ্ধিবৃত্তিকে এআই দ্বারা পাওয়া সম্ভব নয়।

এআইয়ের মাধ্যমে বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি ন্যায়বিচারের বেশ কিছু মৌলিক নীতি লঙ্ঘনও বটে, যা ‘কমন ল’ ব্যবস্থায় অলঙ্ঘনীয়। যেমন বিচারকের বিচার শেষে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত বা রায় প্রদানের বাধ্যবাধকতা, যেন সংক্ষুব্ধ পক্ষ সেই যুক্তির বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে প্রতিকার চাইতে পারে এবং বিচারিক সুবিবেচনাবোধ ও প্রাসঙ্গিকতা আমলে নেওয়ার মানবীয় গুণাবলি অথবা যোগ্যতার সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি। কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের মতে, অর্থনৈতিক চাপের কারণে অত্যন্ত ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার অদূর ভবিষ্যতে প্রশ্ন সাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য হলেও হয়ে উঠতে পারে; তবে এটি কেবলই কারও কারও একটি অনুমান এবং বর্তমান আইনি ব্যবস্থার প্রতিফলন নয়। বর্তমানে পৃথিবীর উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোর আদালতে এআইয়ের ব্যবহার মূলত বিচারিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ‘সহায়ক হাতিয়ার’ বা প্রশাসনিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আইনে স্পষ্ট করে নিষিদ্ধ না হলেও এআই দিয়ে বিচার করা বা রায় লেখা আমাদের বিচারব্যবস্থায় কোনোভাবেই বৈধ বা অনুসরণীয় নয়। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বা এআইচালিত বিচারব্যবস্থার দিকে যেকোনো পদক্ষেপের জন্য দেশে কার্যকর সংবিধান সংশোধন এবং বিচারিক কার্যক্রমের আমূল পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন।

লেখক : আয়ারল্যান্ডে ডক্টরাল গবেষণারত। সহযোগী অধ্যাপক (শিক্ষা ছুটিতে), আইন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং অধিকারকর্মী

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত