আরোপিত বৈশ্বিক শুল্কনীতিকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। স্থানীয় সময় গত শুক্রবার দেশটির সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়ে বলেছে, জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের কোনো অধিকার প্রেসিডেন্টের নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রায় দিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আঘাত হানল দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস বলছে, এই রায় ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে আঘাত হেনেছে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য নির্বাহী আদেশ এবং খুব কমই ব্যবহৃত হওয়া আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ট্রাম্প তার ক্ষমতার সীমা বারবার পরীক্ষা করে চলেছিলেন। আদালতের এই পদক্ষেপ তার সেই ক্ষমতায় লাগাম টানার এক বিরল প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী এই বেঞ্চ এতদিন ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের প্রচেষ্টার প্রতি মোটামুটি সহানুভূতিশীল ছিল এবং তার দ্বিতীয় মেয়াদের এজেন্ডাগুলো বিনা বাধায় বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়েছিল। তবে শুক্রবারের এই রায় সেই গতিকে নাটকীয়ভাবে থামিয়ে দিয়েছে।
বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করতে ট্রাম্প গত বছর ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’(আইইইপিএ)-এ নিহিত জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করেছিলেন। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক রায় দেন, এই আইন প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের অনুমতি দেয় না।
সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মতামতে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে অসীম পরিমাণ, সময়কাল এবং পরিধির শুল্ক আরোপের অসাধারণ ক্ষমতা দাবি করছেন।’ তিনি আরও যোগ করেছেন, ‘এটি প্রয়োগ করতে হলে ট্রাম্পকে অবশ্যই কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন দেখাতে হবে।’
রবার্টস উল্লেখ করেছেন, আইইইপিএ আইনে ‘শুল্ক বা করের কোনো উল্লেখ নেই’। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট শুল্ক আরোপের জন্য এই আইন ব্যবহার করেননি।
রায়ে ৬-৩ ব্যবধানে বিভক্তি ছিল। উদারপন্থি বিচারপতি সোনিয়া সোটোমায়র, এলেনা কেগান এবং কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসনের সঙ্গে রক্ষণশীল রবার্টস, নিল গোরসুচ এবং অ্যামি কোনি ব্যারেট সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে যোগ দেন। বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানা প্রধান দ্বিমত পোষণকারী রায়টি লেখেন এবং তার সঙ্গে রক্ষণশীল ক্লারেন্স থমাস ও স্যামুয়েল আলিতো যোগ দেন।
ক্যাভানা যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার এবং বাণিজ্য বৈষম্য নিয়ে ট্রাম্প যে জাতীয় জরুরি অবস্থার কথা বলেছিলেন, তা তাকে শুল্ক আরোপের জন্য আইইইপিএ ব্যবহারের অধিকার দিয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘এখানে শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিচক্ষণ নীতি হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। কিন্তু নথিপত্র, ইতিহাস এবং নজির হিসেবে এগুলো আইনত বৈধ।’
সর্বোচ্চ আদালত মূলত জরুরি ক্ষমতার ভিত্তিতে প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের অনুমোদন বৈধ ছিল কি না, সেটির প্রতি মনোযোগ দিয়েছে। অন্য সব প্রশ্ন নিম্ন আদালতের ওপর ছেড়ে দিয়েছে এবং ট্রাম্পের শুল্ক চ্যালেঞ্জ করা মামলার একটি আপিল আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে।
মামলাটি মূলত ১২টি মার্কিন অঙ্গরাজ্য ও একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী দায়ের করেছিল। মামলায় ট্রাম্পের ‘পারস্পরিক’ শুল্ক এবং প্রাণঘাতী ওপিওড ফেন্টানাইল বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে চীন, কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর আরোপিত শুল্ককে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।
ফেডারেল সার্কিটের আপিল আদালত গত বছর রায় দিয়েছিল, শুল্ক আরোপে আইইইপিএ ব্যবহার করে ট্রাম্প তার ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করেছেন। তবে তারা সুপ্রিম কোর্টের মতোই সব শুল্ক স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেন। কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না এবং হলে তা কীভাবে হবেআপিল আদালত সিআইটিকে সেটি পুনরায় মূল্যায়ন করতে বলেছে।
এখন সিআইটি সম্ভবত মামলাটি হাতে নেবে, যদিও এর সময়সীমা এখনো নির্ধারিত হয়নি। তিন বিচারকের একটি প্যানেল মামলার প্রথম ধাপের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর মধ্যে দুজন ট্রাম্পসহ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টদের নিয়োগপ্রাপ্ত এবং একজন বারাক ওবামার নিয়োগপ্রাপ্ত।
আইনি প্রতিষ্ঠান ডেচার্টের অংশীদার স্টিভেন এঙ্গেল বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট ‘সাধারণত প্রথা অনুযায়ী এমন কোনো বিষয়ে প্রথমে সিদ্ধান্ত নেয় না যা নিয়ে নিম্ন আদালত কোনো সুরাহা করেনি।’
তিনি বলেছেন, ‘যেসব ক্ষেত্রে জটিল আইনি প্রশ্ন বা বিতর্ক দেখা দেয়, সেগুলো আপিল হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত তা আবারও সুপ্রিম কোর্টে ফিরে আসতে পারে।’
শুক্রবারের রায় ট্রাম্প প্রশাসনকে শুল্ক আরোপের বিকল্প উপায়ের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে। তবে কোনোটিই আইইইপিএ-এর মতো দ্রুত ও সহজে প্রয়োগযোগ্য নয়, ফলে শুল্ক আদায়ে কিছুটা বিলম্বের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বাণিজ্য আইনে বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের আগে সাধারণত পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সময়ের প্রয়োজন হয়।১২২ ধারা ছাড়াও, ক্যাটো ইনস্টিটিউট ১৯৩০ সালের শুল্ক আইনের ৩৩৮ ধারাকে প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ধারাটি প্রেসিডেন্টকে এমন দেশগুলোর ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের অনুমতি দেয়, যারা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে।
১২২ ধারা ট্রাম্পকে তাৎক্ষণিকভাবে ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ দেয়। এর জন্য ট্রেড এক্সপানশন অ্যাক্টের ২৩২ ধারার আওতায় ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো পণ্যের ওপর শুল্ক বসাতে যে সময়সাপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন হয়, তা লাগে না।
ক্যাটো বলেছে, তাৎক্ষণিক এই বিকল্পটি ট্রাম্পের কাছে ‘যথেষ্ট আকর্ষণীয়’ মনে হতে পারে। তবে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও উল্লেখ করেছেএই ১৫ শতাংশ শুল্ক মাত্র ১৫০ দিনের জন্য বৈধ থাকবে এবং এর মেয়াদ বাড়াতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ১২২ ধারাসহ বিকল্প আইনি পথ
থাকলেও, শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট যে আইইইপিএ শুল্ক বাতিল করেছে, তার মতো বিস্তৃত হবে না।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফ্লিন্ট গ্লোবালের বাণিজ্য প্রধান স্যাম লো গ্রাহকদের উদ্দেশে লেখা এক নোটে বলেছেন, ‘এই হাতিয়ারগুলো আইইইপিএ-এর মতো বিস্তৃত ও ব্যাপক নয়। বাতিল হওয়া আইইইপিএ শুল্কের তুলনায় নতুন করে আরোপিত শুল্কের সময়সীমা ও পরিধির মধ্যে ব্যবধান থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’
আইইইপিএ-এর আওতায় আদায়কৃত শুল্ক রাজস্ব সরকারকে ফেরত দিতে হবে কি না, তা এখনো অস্পষ্ট। সর্বোচ্চ আদালত এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়নি। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে এই অর্থের পরিমাণ অন্তত ১৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
ক্যাভানা তার ভিন্নমতের রায়ে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘হয়তো আমদানিকারকদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ফেরত দিতে হতে পারে যারা আইইইপিএ শুল্ক পরিশোধ করেছিলেন, যদিও কিছু আমদানিকারক ইতিমধ্যে সেই খরচ ভোক্তাদের বা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন’। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘মৌখিক যুক্তিতর্কের সময় যেমন স্বীকার করা হয়েছিল, ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াটি সম্ভবত একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে।’
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স জানিয়েছে, কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুল্ক ফেরতের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানালেও, এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তারা আরও জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এ বিষয়ে ‘উদ্বেগজনক নীরবতা’ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দিয়েছেন, শুল্ক ফেরতের প্রশ্নটি সিআইটি বা ইউএস কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সমাধান করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই শুল্ক পরিশোধকারীরা টাকা ফেরতের দাবিতে অসংখ্য মামলা দায়ের করেছেন। তবে এগুলো সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি হওয়া মূল মামলার সঙ্গে একীভূত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বেকার বটসের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যদলের প্রধান ম্যাথিউ ওয়েস্ট এর মতে, যতক্ষণ না নিম্ন আদালত ফেরত প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হবে তা নির্ধারণ করছে শুক্রবারের রায় ব্যবসায়ীদের ‘অনিশ্চয়তার মধ্যে’ ফেলে দিয়েছে।