বন্যপ্রাণীর পাশে আদনান

ইট-পাথরের নগরী ঢাকায় প্রতিদিন হাজারো মানুষের ব্যস্ত যাপনের আড়ালে কিছু মানুষ আছেন, যারা নীরবে প্রকৃতি আর প্রাণের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন। তেমনই একজন মোস্তফা আদনান। প্রাণিবিদ্যা ও মাৎসবিদ্যায় শিক্ষিত এই তরুণের জীবনচর্চার বড় অংশ জুড়ে আছে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, উদ্ধার এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজ।

সিরাজগঞ্জে জন্ম নেওয়া মোস্তফা আদনানের পড়াশোনা শুরু প্রাণিবিদ্যা দিয়ে। ঢাকার হবীবুল্লাহ বাহার কলেজ থেকে বিএসসি (সম্মান) সম্পন্ন করার পর তিনি সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা থেকে মাৎসবিদ্যায় এমএসসি শেষ করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জে বসবাস করছেন। পরিবারে আছেন তার মা ও চার বোন সবাই বড় এবং বিবাহিত।

২০১৭ সালের শেষ দিকে প্রাণিবিদ্যায় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই প্রাণীদের প্রতি তার আগ্রহ ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে। পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান আর বাস্তবতার মেলবন্ধনে তিনি বুঝতে শুরু করেন মানুষ কতটা নির্দয় হতে পারে বন্যপ্রাণীর প্রতি। বিশেষ করে সাপসহ নানা বন্যপ্রাণীকে অযথা ভয়, ভুল ধারণা ও অজ্ঞতার কারণে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই বাস্তবতাই তাকে বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করার পথে টেনে আনে।

ঢাকায় বসবাসের কারণে শুরুতে মাঠপর্যায়ে কাজের সুযোগ খুব বেশি পাননি আদনান। তখনো কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তবে প্রথম কাজটি আজও তার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। কোনো এক ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে থাকার সময় খবর পান, তার গ্রাম থেকে প্রায় ২০-২৫ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে একটি গন্ধগোকুল আটকে রাখা হয়েছে। সময় নষ্ট না করে তিনি বন বিভাগের সহযোগিতায় সেটি উদ্ধার করেন এবং বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন। সেই উদ্ধারই ছিল তার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে হাতেখড়ি।

এরপর একে একে যুক্ত হন বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে। ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সাপ সম্পর্কে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেন এবং রেসকিউ কাজে অংশ নেন। পরবর্তী সময় ‘সেভ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার’-এর মাধ্যমে তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।

এ পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক সাপ উদ্ধারে তিনি প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি দেশের নানা স্থান থেকে প্রায় দুই শতাধিক পাখি উদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। শুধু উদ্ধার নয়, মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাই তার কাজের মূল লক্ষ্য।

বর্তমানে তিনি ‘সেভ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার’-এ স্নেক কনজারভেশন অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। এ ছাড়া ‘তড়ড়ষড়মু চষঁং’ নামের একটি সংগঠনে সহকারী পরিচালক হিসেবে প্রাণিবিদ্যা শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, কর্মশালা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ফড়িং, প্রজাপতি ও পাখি নিয়ে কাজের ক্ষেত্রেও তার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। ঢাকার বোটানিক্যাল গার্ডেনসহ বিভিন্ন জায়গায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি একাধিক প্রোগ্রামের আয়োজন করেছেন, যেখানে তরুণ শিক্ষার্থীরা সরাসরি জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে।

সম্প্রতি পাঁচটি জেলায় মেছো বিড়াল নিয়ে পরিচালিত সচেতনতা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন আদনান। মেছো বিড়ালকে বাঘ ভেবে হত্যা করার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নির্দেশনায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেন তিনি ও তার সহকর্মীরা। তার মতে, মেছো বিড়াল অত্যন্ত লাজুক এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী।

এই কাজ করতে গিয়ে সমস্যাও কম নয়। লজিস্টিক সাপোর্টের অভাব, নিজস্ব অর্থ ব্যয়, কখনো সাধারণ মানুষের কটাক্ষ সবই মোকাবিলা করতে হয়। তবুও আদনান মনে করেন, একটি প্রাণ বাঁচানোর আনন্দের কাছে এসব কিছুই তুচ্ছ। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় সম্প্রতি বাংলাদেশ বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন ফেডারেশনের পক্ষ থেকে তার সংগঠন সম্মাননা স্মারক পেয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আদনান বলেন, মানুষ ও প্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করাই তার লক্ষ্য। বিশেষ করে নিজ জেলা সিরাজগঞ্জে বন্যপ্রাণী নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে চান তিনি। এখনো স্থায়ী কর্মে যুক্ত না হলেও সুযোগ পেলে কোনো রেসকিউ কাজই তিনি এড়িয়ে যান না। গত মাসেও কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকা থেকে এক অসাধু বিক্রেতার কাছ থেকে প্রায় ১৫টি দেশীয় প্রজাতির বক উদ্ধার করে অবমুক্ত করেছেন।

তার বিশ্বাস, পৃথিবীকে সুস্থ রাখতে হলে বন্যপ্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। আর সেই বিশ্বাস নিয়েই তিনি নীরবে, নিরলসভাবে এগিয়ে চলেছেন।

লেখক : ফিচার রাইটার