বইমেলার জটিলতা কাটল

প্রকাশক ঐক্যের সব শর্ত মেনে নেওয়ায় তারা অংশ নিচ্ছে ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া বইমেলায়। গতকাল রবিবার দিনভর ত্রিপক্ষীয় ‘রশি টানাটানির’ পর শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই প্রতিবেদন লেখার সময় রাত সাড়ে ১০টায় লটারি চলছে। মেলায় থাকবে না প্রকাশক ঐক্যের শর্ত অনুযায়ী কোনো প্যাভিলিয়ন। অন্য বছর যেখানে ফেব্রুয়ারির শুরুতে বইমেলার পর্দা উঠতে দেখা যায়, এবার সেখানে মাসের শেষ সপ্তাহে এসে মেলা শুরু করছে বাংলা একাডেমি।

মূলত নির্বাচনের কারণে এবার ভাষার মাসের শুরুতে আয়োজন করতে না পেরে মেলা উদ্বোধনের জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজার মধ্যে বইমেলায় আপত্তি তুলে অর্ধেকেরও বেশি প্রকাশক বর্জন করায় শেষ পর্যন্ত ওইদিন মেলা শুরু করা যায়নি।

বিএনপির নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সমস্যা সমাধানে দফায় দফায় বৈঠক করেছে বর্জনকারী প্রকাশকদের সঙ্গে। বিনামূল্যে স্টল বরাদ্দ প্রদানসহ বেশ কিছু শর্তে ওইসব প্রকাশক রাজি হওয়ায় ২৬ ফেব্রুয়ারি মেলার নতুন দিন ধার্য করেছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ওইদিন প্রথমবার বড় সরকারি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। ফলে মেলার আয়োজনে কোনো ত্রুটি রাখতে চায় না প্রশাসন। এরই মধ্যে বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ তুলে শনিবার প্রকাশকদের সংগঠন ‘প্রকাশক ঐক্য’ জানিয়েছিল তারা মেলায় অংশ নিচ্ছে না। এতে ‘বিব্রতকর’ পরিস্থিতিতে পড়েন কর্মকর্তারা। গতকাল শেষ মুহূর্তে বিবাদমান সব পক্ষকে এক জায়গায় বসিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছিল সকাল থেকেই। রাত পৌনে ১০টায় জানা গেল, সমস্যার সমাধান হওয়ায় প্রকাশকরা বইমেলায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তবে বইমেলা ঘিরে এসব জটিলতা সার্বিকভাবে পাঠকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। শুরুতে গত ডিসেম্বরে বইমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও প্রকাশকসহ বিভিন্নজনের আপত্তির মুখে সেখান থেকে সরে আসে বাংলা একাডেমি। দীর্ঘদিনের রীতি অনুযায়ী, প্রতি বছর পহেলা ফেব্রুয়ারি ‘অমর একুশে বইমেলা’র আয়োজন করে থাকে বাংলা একাডেমি। ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দেওয়ায় মেলাটি দুই মাস এগিয়ে এনে গত ডিসেম্বরে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলা একাডেমি। কিন্তু প্রকাশকদের একাংশ তখন সেটির বিরোধিতা করে। সেই সঙ্গে ৩০টির বেশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ‘অতীতের রীতি মেনে ভাষার মাসে’ বইমেলা আয়োজনের দাবি জানানো হয়।

এ অবস্থায় ডিসেম্বরে মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে কর্তৃপক্ষ। এরপর নির্বাচন ও সরকার গঠন শেষে মেলা শুরুর নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২০ ফেব্রুয়ারি। ওই সময় রোজা শুরু হয়ে যাওয়ায় ‘পাঠকশূন্যতা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির শঙ্কা’ থেকে বইমেলা পিছিয়ে ঈদুল ফিতরের পরে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায় প্রকাশকদের বড় একটি অংশ। কিন্তু তাতে সাড়া না দিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকার কথা জানায় বাংলা একাডেমি।

‘বইমেলা আয়োজনের কাজ যখন প্রায় ৬০ ভাগ সম্পন্ন, তখন কিছু প্রকাশক ঈদের পর বইমেলা আয়োজন করার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন... তখন এপ্রিল মাস এসে যাবে। এপ্রিল মাসে প্রচ- তাপপ্রবাহ থাকে। ধুলোবালির উপদ্রব বাড়ে। কালবৈশাখীসহ বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা থাকে প্রবল। এ সময় মাসব্যাপী বইমেলার আয়োজন করা বাস্তবসম্মত নয়’ গত ৫ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের বলেন বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব সেলিম রেজা। তার এ বক্তব্যের তিন দিনের মাথায় একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দেয় অন্যপ্রকাশ, বাতিঘর, ইউপিএল এবং পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সসহ ৩২১টি প্রকাশনা সংস্থা।

গতকাল নানা নাটকীয়তার পর রাতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমি প্রকাশক ঐক্যের সব শর্ত মেনে নেওয়ায় এবার মেলায় সব ধরনের প্রকাশক অংশ নিচ্ছেন।