দুর্নীতির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ

নতুন সরকারের কাঁধে চেপে বসেছে দুর্নীতি। সীমাহীন অব্যবস্থাই এর প্রধান কারণ। সরকারের প্রশাসন থেকে শুরু করে হেন কোনো দপ্তর নেই,  যেখানে দুর্নীতি তার নখর দাখিল করেনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পৌঁছেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেই নীতিনৈতিকতার টুঁটি ধরতে তেমনভাবে সফল হয়নি। সরকারের প্রধান উপদেষ্টা দুর্নীতির মূলোৎপাটনের চেষ্টা করলেও, অন্য উপদেষ্টারা সে কাজে কোনো সাফল্য আনতে পারেননি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের এনজিও টাইপ বুদ্ধিমত্তা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছিল, যা জনমনে ড. ইউনূসকেই বিতর্কিত করেছে। তবে একমাত্র ব্যাংক খাতের দুর্নীতি বন্ধ করতে বিশেষ প্রণোদনা ও ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তারা। সেখানে লুট ও পাচার পরিস্থিতি কমে এলেও তদবিরবাজদের উৎখাত করা যায়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা যথেষ্ট আশার জন্ম দিয়েছিল।

সাধারণ মানুষের সুশাসনের যে আকাক্সক্ষা, গণতান্ত্রিক সরকার না এলে তা সম্ভব নয় এটা পুরোপুরিই বোঝা গেছে। নির্বাচনের পর নতুন সরকার কায়েম হওয়ায় এখন সেই আকাক্সক্ষায় চাপ পড়েছে। একসঙ্গে সব সেক্টরের দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলা সহজ হবে না সরকারের পক্ষে। তবে তা কমিয়ে আনা সম্ভব, যদি মন্ত্রীরা তাদের লক্ষ্য অর্জনে নিরলসভাবে কাজ করেন, দুর্নীতিমুক্ত থাকতে পারেন। রবিউল আলম চাঁদা নিয়ে যে ফতোয়া দিয়েছেন, তাতে তারেক রহমান কামিয়াব হতে পারবেন বলে মনে হয় না। হাসিনা সরকারের লেজুড়দের প্রশাসন যদি অতীতের দুর্নীতির ধারা ভুলে গিয়ে নিজেদের জনগণের প্রতি নমনীয় ও মানবিক দৃষ্টিকে প্রসারিত করেন, তাহলে তৃণমূলের মানুষ সেবা পাবে, এতে ভুল নেই। জনস্বার্থেই দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলা জরুরি এটা সাধারণ মানুষ যতটা সহজে বোঝেন, ক্ষমতাসীন রাজনীতিক ও অন্য দলের লোকেরা তা অনুধাবন করতে পারবেন না। অথচ নির্বাচনের সময় তারা সবাই অঙ্গীকার করেছিলেন, জনআকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করবেন। প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারসহ নৈতিকভাবে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ছাড়া তাদের চেতনাকে ন্যায় ও কল্যাণের পথে আনা যাবে না। এই প্রশিক্ষণ পুলিশসহ সব সেক্টরে দিতে হবে। বিশেষ করে আইন-আদালত বিষয়ে দুর্নীতি এতটাই ছড়িয়েছে যে,  তা সংস্কার না করলে চলবে না। দুর্নীতি দমন কমিশন, সিআইডি ও অন্যান্য আইনি সংস্থার ভেতর-বাইরে যে দুর্নীতি রয়েছে, তা শেকড়সুদ্ধ উৎপাটন করতে হলে ওই সংস্থাগুলোর আইনধারা পরিবর্তন প্রয়োজন।

দুদককে প্রায় ক্ষমতাহীন কমিশনে পরিণত করেছিল হাসিনা সরকার। দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মইদুল ইসলাম বলেছেন, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে প্রথমত সুশাসন প্রয়োজন। সুশাসন বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, প্রশাসনের সর্বত্র জবাবদিহি, নজরদারি, তদারকি ইত্যাদি। যেখানে অব্যবস্থা ও দুর্নীতি পাওয়া যাবে, সেখানে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। দুদককে শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। দুদকের কাজে সরকার ও রাজনীতির হস্তক্ষেপ করা যাবে না। দুদকের নিজস্ব প্রসিকিউশন থাকা দরকার। নিজস্ব আইনি কাঠামো প্রয়োজন, নিজস্ব লোকবল ও বিচার করার জন্য ‘দুদক আদালত’ প্রতিষ্ঠা করা হলে, দুর্নীতির শেকড় কেটে সুশাসনের পরিবেশ রচনা দুঃসাধ্য হবে না। নতুন সরকারের কাঁধে যে পাহাড়সমান দুর্নীতির বোঝা চেপেছে, তা অপসারণ ধীরে ধীরেই হবে, রাতারাতি হওয়ার নয়। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু সরকার-সাংসদরা নয়, সেবাপ্রার্থী জনগণেরও দায় রয়েছে। জনগণকে সেই প্ররোচনা ও সাহস সরকারকে জোগাতে হবে, যাতে দুর্নীতিবাজকে চিহ্নিত করে প্রকাশ্যে নিয়ে আসা যায়। পুলিশ এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে। একজন চাঁদাবাজকে ধরে মাইকে ঘোষণা দিয়ে পুলিশ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সব সেক্টরের দুর্নীতিবাজকে ধরে জনসম্মুখে ঘোরানো হলে, সমাজে একটি ভালো প্রভাব পড়বে। তখন দুর্নীতিবাজদের আত্মা শুকিয়ে যেতে বাধ্য। আমরা কি সরকারের কাছে তা আশা করতে পারি না?