‘মানবীয় দয়ার দুধে পরিপূর্ণ’ কথাটি উইলিয়াম শেকসপিয়রের বিখ্যাত নাটক ‘ম্যাকবেথ’-এর একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ধ্রুপদি উক্তি। ম্যাকবেথের মধ্যে সিংহাসন আরোহণের তীব্র আকাক্সক্ষা বা উচ্চাকাক্সক্ষা থাকলেও, সেই পথ ধরে নিষ্ঠুরভাবে এগিয়ে যাওয়ার মতো কঠোরতা তার ছিল না। কিন্তু আমাদের সমাজে খাদ্যপণ্য নিয়ে ভেজালের ছড়াছড়ি ও ভেজালকারীদের প্রাণঘাতী অপকাণ্ডের দৌরাত্ম্য কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে এর ফের চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সচিত্র বার্তা ১৭ সেপ্টেম্বর উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরে। ‘বিষাক্ত কেমিক্যালে দুধ’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলো থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটাসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলো দুধ সংগ্রহ করে। অনুসন্ধানে উন্মোচিত চিত্র কোনো রূপকল্প নয়, ভয়াবহ বাস্তব চিত্র। দুধ সিন্ডিকেটের থাবার বিস্তার ঘটে চলেছে প্রশাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতকৃত এসব ভেজাল দুধ সাধারণত খালি চোখে বা সাধারণভাবে ধরার কোনো উপায় নেই। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের পাশাপাশি চরম বিপাকে পড়ছে দুগ্ধ সংগ্রহকারী সংস্থাগুলো ও সৎ খামারিরা।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে বেড়া, সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রামে প্রকাশ্যে-গোপনে চলছে বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত কৃত্রিম দুধ তৈরির কারখানা। আসল দুধ থেকে ননি তুলে নিয়ে পানি ও সয়াবিন-পাম তেল ব্লেন্ডারে ফুটিয়ে কৃত্রিম ফ্যাট তৈরি করা হয়। পাশাপাশি ছানার পানির সঙ্গে ডিটারজেন্ট, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ও কস্টিক সোডা মিশিয়ে প্রস্তুত করা হয় ফেনা ও গাঢ় কৃত্রিম দুধ। অসাধুরা দুধের সংজ্ঞাটা তো পাল্টে দিলই, একই সঙ্গে মানুষ শারীরিক শক্তি-বলবর্ধকের অন্যতম অনুষঙ্গ দুধ পান করছে যে উদ্দেশে, তা হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভোক্তা দুধের নামে বিষ কিনে খাচ্ছে। ‘... আমি কত কী খাই, ভস্ম আর ছাই, তব প্রেমামৃত খাই নে...’ রজনীকান্ত সেনের জনপ্রিয় ব্যঙ্গাত্মক এই গানের স্বরলিপি শুধু ভেজালের ছড়াছড়ি নয়, আমাদের সমাজে আরও বহু বিষয়েই কতটা প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। শুধু শিশু আর বয়স্ক নয়, সব বয়সীদের জন্যই আদর্শ খাদ্য আর জাদুকরী এক পানীয় দুধ। তাতে একাধারে শর্করা (ল্যাকটোজ), আমিষ, ফ্যাট সব কটি ভিটামিন ও মিনারেল আছে। কিন্তু দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে যে দুধের সন্ধান মিলেছে তা তো দুধ নয়, বিষের নামান্তর। বিষাক্ত কেমিক্যালে দুধ আর দুধে কেমিক্যালের সংমিশ্রণ এই দুই-ই মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকর বটে, কিন্তু সিন্ডিকেটের তৈরি সংজ্ঞা পাল্টে দেওয়া বিষে বিষে বিষাক্রান্ত এই তথাকথিত দুধ তো আরও বিপজ্জনক।
প্রশ্ন হচ্ছে, অসাধু খাদ্যপণ্য ব্যবসায়ী নামের দুর্বৃত্তরা জীবন নিয়ে জুয়া খেলে নিজেদের আখের গোছানোর অপপ্রক্রিয়া এভাবেই চালিয়ে যাবে? এটি এখন সাধারণ সমস্যা নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য রীতিমতো ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে খাদ্যে ভেজাল রোধে বেশ কয়েকটি আইন রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা আইন ২০১৩, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এবং দণ্ডবিধি ২৭২ ধারা। এসব আইনে খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান মেশানো বা ভেজাল বিক্রি করলে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে এ যেন ‘কাজির গরু কিতাবে আছে গোয়ালে নেই’র মতো অবস্থা। আইন প্রয়োগে দুর্বলতা ও তদারকির ঘাটতি থাকায় অপরাধীরা সহজে নানা ক্ষেত্রে কীভাবে পার পেয়ে যায়, তার অনেক নজির আমাদের সামনে আছে। পাবনার ভেজাল দুধ সিন্ডিকেট এ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে এই অমোঘ বাণী তো আমাদের বাস্তবতায় কতভাবেই বিবর্ণ।
এ নিয়ে কথা হয়েছে বিস্তর। আমরা মনে করি আর কোনো কথা নয়, খাদ্যপণ্য সন্ত্রাসীদের মূলোৎপাটনে চলুক সাঁড়াশি অভিযান। সমন্বিতভাবে কঠোর ও লাগাতার জোরদার অভিযান চালানোর বিকল্প নেই। মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে যারা তুঘলকি কাণ্ড চালাচ্ছে, তারা জনশত্রু। তাদের ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়। ব্যবসায়ী নামের খাদ্যপণ্য সন্ত্রাসীদের রোগটা যেহেতু গুরুতর, সেহেতু টোটকা দাওয়াইয়ে এ ব্যাধি সারবে না। এটি শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, জাতির অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন। জনশত্রুদের চারণভূমি হতে পারে না রক্তস্নাত বাংলাদেশ।