লিঙ্গ সমতার প্রশ্নটি নারীর অধিকার এবং নারী-পুরুষ সম্পর্কের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তবে এর আওতা আরও বিস্তৃত। এটি একটি রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও আধুনিক তার সূচক। যে সমাজে নারী নিজের শিক্ষা, কাজ, মত, নেতৃত্ব ও নিরাপত্তার অধিকার নিয়ে স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে পারে না, সে সমাজ বাইরে থেকে যতই উন্নত দেখাক, তার ভেতরের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নারীর অধিকার কোনো সমাজেই একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রাচীন সমাজে নারীর ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই ঘর, পরিবার ও সন্তান পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের ভেতরেই আমরা দেখি, নারী শুধু ঘরের মানুষ নন; তিনি উৎপাদনের অংশ, জ্ঞানের অংশ, সংস্কৃতির অংশ এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও অংশ। ইউরোপে ১৮শ ও ১৯শ শতকে নারীর ভোটাধিকার আন্দোলন আধুনিক নাগরিক অধিকারের ধারণাকে শক্তিশালী করে। ভোটাধিকার, শিক্ষা, সম্পত্তির অধিকার ও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার এসব আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও নারী মুক্তির প্রশ্ন গভীরভাবে জড়িত। বেগম রোকেয়া শুধু নারী শিক্ষার কথা বলেননি; তিনি এমন এক সমাজ কল্পনা করেছিলেন, যেখানে নারী মানুষ হিসেবে নিজের বুদ্ধি, শ্রম ও সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়াতে পারবে। তার কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়। আবার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীরা শুধু ভুক্তভোগী ছিলেন না; তারা সংগঠক, সেবাদাতা, আশ্রয়দাতা, যোদ্ধা ও প্রেরণার উৎস ছিলেন। রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসে নারীর অবদান তাই কোনো প্রান্তিক বিষয় নয় বরং জাতীয় ইতিহাসের কেন্দ্রীয় অংশ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। মেয়েদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বেড়েছে, মাতৃস্বাস্থ্যসেবায় উন্নতি হয়েছে, স্থানীয় সরকারে নারী প্রতিনিধিত্ব তৈরি হয়েছে, জাতীয় সংসদেও সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বেড়েছে। কর্মক্ষেত্রে নারী আজ পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা খাতে ভূমিকা রাখছেন। একজন পোশাকশ্রমিক নারী যখন নিজের আয় দিয়ে সন্তানের পড়াশোনা চালান, একজন ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্য যখন বাল্যবিবাহ বন্ধে দাঁড়ান, একজন নারী উদ্যোক্তা যখন গ্রামের মেয়েদের কাজ শেখান তখন লিঙ্গ সমতা কোনো তাত্ত্বিক শব্দ থাকে না; সেটি বাস্তব উন্নয়নের চিত্র প্রকাশ করে।
কিন্তু অগ্রগতির পাশাপাশি বাস্তবতার কঠিন দিকও আছে। এখনো বহু পরিবারে মেয়ের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অনেক জায়গায় নারীর কাজকে ‘সহায়তা’ বলা হয়, ‘অবদান’ বলা হয় না। একই কাজ করেও নারী কম মজুরি পান। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, হয়রানি, সামাজিক অপবাদ এবং পারিবারিক চাপ নারীর অগ্রযাত্রাকে আটকে রাখে। নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, অনলাইন হয়রানি এবং চরিত্রহননের সংস্কৃতি এখনো বড় সমস্যা। এই জায়গাতেই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন আসে। যদি থানা, আদালত, স্থানীয় সরকার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নারীকে সমান মর্যাদায় না দেখে, তাহলে কাগজের অধিকার বাস্তব অধিকার হয়ে ওঠে না। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান শুধু আইন প্রয়োগ করে না; তারা নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করে, জবাবদিহি নিশ্চিত করে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ধর্মকে অনেক সময় নারীর অগ্রগতির পথে বাধা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অথচ ধর্মের নামে যা বলা হয়, তার অনেকটাই সামাজিক অভ্যাস, পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যা এবং ক্ষমতার সুবিধাজনক ব্যবহার। বাংলাদেশ একটি আধুনিক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের ভিত্তি সংবিধান, নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং আইনের শাসন। সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা স্পষ্টভাবে বলা আছে। রাষ্ট্রের এই অঙ্গীকার কোনো দয়া নয়; এটি নাগরিক অধিকারের ভিত্তি।
ধর্মীয় মূল্যবোধ ব্যক্তিজীবন ও সামাজিক নৈতিকতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবিধানই অভিন্ন আইনগত কাঠামো। একটি সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি শিক্ষা, অর্থনীতি ও নেতৃত্বে পিছিয়ে থাকে, তাহলে উন্নয়ন কখনো পূর্ণতা পায় না। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন পরিবারে শিশুর শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য উন্নত করে। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ স্থানীয় সমস্যাকে নতুনভাবে সামনে আনে। নারী যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে থাকে, তখন পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এসব বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা নীতিতে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ বাড়ে। ফলে লিঙ্গ সমতা শুধু নৈতিক বিষয় নয়; এটি উন্নয়ন, শান্তি ও স্থিতিশীলতারও শর্ত। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে হলে কয়েকটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় ছোটবেলা থেকেই ছেলেমেয়ে উভয়ের সমান মর্যাদা, সম্মতি, সহমর্মিতা ও দায়িত্ব শেখাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় শিক্ষার মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রচার করতে হবে, যাতে ধর্মকে ভয় বা নিয়ন্ত্রণের ভাষা না বানিয়ে মর্যাদা ও দায়িত্বের ভাষা বানানো যায়। তৃতীয়ত, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, ন্যায্য মজুরি, মাতৃত্ব ও পরিচর্যা সহায়ক নীতি এবং দক্ষতা উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, বিচারব্যবস্থা ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও সহজপ্রাপ্য, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
ডিজিটাল যুগে নারীর অংশগ্রহণও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি, অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল উদ্যোক্তা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ইত্যাদি খাতে নারীকে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন সহিংসতা ও হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দরকার। কারণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার থাকলেও নিরাপত্তা না থাকলে নারী সেখানে স্বাধীনভাবে অংশ নিতে পারে না। বাংলাদেশ যদি সত্যিই শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে চায়, তাহলে লিঙ্গ সমতা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করে দেখা যাবে না। লিঙ্গ সমতার পথই শক্তিশালী রাষ্ট্রের পথ।
লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও বিশ্লেষক