চট্টগ্রামে হঠাৎ বিস্ফোরণে বিভীষিকার ভোর

‘হঠাৎ বিস্ফোরণের পর দেখি ভবনের ওপরের ফ্ল্যাট থেকে দগ্ধ নারী-পুরুষ ও শিশুরা চিৎকার করতে করতে নেমে আসছেন। বিস্ফোরণের শব্দটি ছিল বিকট। মনে হচ্ছিল পুরো ভবনটি এখনই ভেঙে পড়বে। বিস্ফোরণের পরপরই আগুন ধরে যায়। শরীরে আগুন নিয়ে ওই বাসা থেকে সবাই নিচের দিকে নেমে আসেন।’ গতকাল সোমবার ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর ‘এইচ’ ব্লক এলাকার ছয়তলা ‘হালিম মঞ্জিল’ নামের ভবনের তৃতীয়তলায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা দেশ রূপান্তরের কাছে এভাবেই বর্ণনা করছিলেন ভবনটির তত্ত্বাবধায়ক মো. সম্রাট।

এ ঘটনায় তিন শিশুসহ নয়জন দগ্ধ হয়েছে। গতকাল ভোরে তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সর্বশেষ সোমবার বিকেল ৫টার দিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দগ্ধ নয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দুপুরেই তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দগ্ধরা হলো আয়েশা (৪), আনাছ (৭), উম্মে আইমান (১০), শাওন (১৭), সাখাওয়াত (৪৬), শিপন (৩২), সুমন (৪০), রানী আক্তার (৪০) ও পাখি আক্তার (৩৫)। তাদের মধ্যে রানী আক্তার, পাখি আক্তার ও সাখাওয়াতের শ্বাসনালি শতভাগ পুড়ে গেছে। শিপনের পুড়েছে ৮০, সুমন ও শাওনের ৪৫, আয়েশার ২০, আনাছের ২৫ এবং উম্মে আইমানের ২৫ ভাগ।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের (জোন-১) উপসহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা হচ্ছে রান্নাঘরে গ্যাস জমে ছিল। চুলায় আগুন ধরাতে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ধরে যায়।’

গতকাল দুপুরে দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, হালিম মঞ্জিলের নিচতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা রয়েছে। সবকটি তলায় চারটি করে ফ্ল্যাট বা ইউনিট আছে। বিস্ফোরণ ঘটেছে তৃতীয়তলায়। ওই ফ্ল্যাটে থাকেন সাখাওয়াত হোসেন।

তৃতীয়তলায় সাখাওয়াতের ফ্ল্যাট ছাড়াও আরও তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে। বিস্ফোরণের ফলে ভবনের দোতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত প্রত্যেক ফ্ল্যাটের দরজা-জানালা ভেঙে গেছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলায় লিফটের দরজাও ভেঙে গেছে।

সাখাওয়াতের ঠিক মুখোমুখি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকেন জসীম উদ্দিন। পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন শামীমা আক্তার তমা নামে এক নারী। সেখানে তিনি একটি বিউটি পার্লার পরিচালনা করেন। অন্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা সবাই ঢাকায় ছিলেন।

প্রতিবেশী জসীম উদ্দিন বলেন, ‘ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে সাখাওয়াত হোসেনের পরিবারের সদস্যরা সাহরি খেতে বসেছিলেন। আমরাও খেতে উঠেছিলাম। হঠাৎ বিস্ফোরণে দরজা-জানালার গ্লাস ভেঙে যায়। ফ্রিজ, আসবাবপত্র মেঝেতে পড়ে যায়।’

প্রতিবেশী শামীমা আক্তার তমা বলেন, ‘ওই বাসা থেকে চিৎকার শুনে দরজায় গিয়ে দেখি তারা দৌড়ে ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন। ঘরের ভেতর আগুন জ্বলছিল। বের হওয়ার সময় তাদের শরীরে আগুন দেখা গেছে।’

জানা গেছে, হালিম মঞ্জিলের মালিক যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী দিদারুল আলম। ২০১০ সালে তিনি ভবনটি নির্মাণ করেন। ভবনে মোট ২৪টি ইউনিট রয়েছে। দিদারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সচেতন ব্যক্তি। ভবনের গ্যাস লাইনে কোনো লিকেজ ছিল না। সবসময় লাইন মেরামত করে থাকি। তবে ঠিক কী কারণে এ ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটল, তা বোধগম্য হচ্ছে না।’

জানা গেছে, দেড় বছর আগে তৃতীয়তলার ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিলেন সাখাওয়াত হোসেন। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক কর্মচারী নিয়ে তিনি ওই ফ্ল্যাটে থাকেন। চিকিৎসক দেখাতে কয়েক দিন আগে ছোট ভাই সুমন পরিবার নিয়ে তার (সাখাওয়াতের) বাসায় আসেন। সাখাওয়াত নগরের হালিশহর এলাকায় একটি মোটর গ্যারেজ পরিচালনা করেন।

এদিকে দগ্ধ নয়জনের সবার অবস্থাই ‘আশঙ্কাজনক’ বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের রেজিস্ট্রার আশফাকুল আতিক। তিনি জানান, দগ্ধদের সবারই শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবার অবস্থাই আশঙ্কাজনক। উন্নত চিকিৎসার জন্য নয়জনকেই ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।’

এদিকে রাজধানীর হাজারীবাগ রায়েরবাজার এলাকার একটি বাসায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে শিশুসহ একই পরিবারের চারজন আগুনে দগ্ধ হয়েছেন। গতকাল ভোররাত ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় দগ্ধরা হলেন শেখ নোমান (৩৫), তার স্ত্রী পিংকি আক্তার (৩০), ছেলে রোহান (৩) ও শ্যালক অপু (২৩)।

দগ্ধ শেখ নোমান নেত্রকোনার খালিয়াজুরী থানার মোহাম্মদপুর এলাকার শেখ গোলাম মাওলা ছেলে। বর্তমানে পূর্ব রায়েরবাজারে ১৪৭ নম্বর জাহানারা ভিলার নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন।

উদ্ধারকারী প্রতিবেশী মোহাম্মদ মামুন গণমাধ্যমকে জানান, হাজারীবাগ রায়েরবাজারের জাহানারা ভিলার ছয়তলা ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটে গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ওই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। পরে তাদের দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

গতকাল জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে আবাসিক চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান জানান, দগ্ধ চারজনের মধ্যে শেখ নোমান ৭০ শতাংশ দগ্ধ তার স্ত্রী পিংকি আক্তার ৭৫ শতাংশ, দগ্ধ তার ছেলে রোহান ৩৫ শতাংশ দগ্ধ ও তার শ্যালক অপু ৫০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছেন। তাদের সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক।