বিচার বিভাগে দলীয়করণ নয়

রাষ্ট্র সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনায় সবার আগে প্রয়োজন সংবিধান ও আইন এবং এর যথাযথ প্রয়োগ। সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংবিধান, আইনবিষয়ক বিধি-বিধান প্রণয়ন, বাস্তবায়নসহ আইন এবং বিচারসংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন করে থাকে। জাতীয় সংসদে বিল আকারে আইন পেশ এবং তা বাস্তবায়নের মতো গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয় এ মন্ত্রণালয়কে। আইন বিশ্লেষকরা বলেন, স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ দশকের বেশি সময়ে আইন মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগ তার স্বকীয়তায় চলতে পারেনি। এর বড় কারণ একে রাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে করায়ত্ত করার প্রবণতা ছিল স্পষ্ট। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে আইন ও বিচার বিভাগকে দলীয়করণ নিয়ে অভিযোগ ছিল বিস্তর। নতুন সরকার এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসবে এই প্রত্যাশা এখন আইন ও বিচারসংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনের।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি। সঙ্গতকারণেই আইন ও বিচার বিভাগের ভূমিকা কী হয় বা হবে, তা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ওপর চোখ থাকবে আপামর জনতা তথা বিচারপ্রত্যাশী জনগণের। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান।

এ মন্ত্রণালয় আইন ও বিচারসংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিভাগ যেমন সুপ্রিম কোর্ট, অধস্তন আদালত, বিচারক নিয়োগকারী জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন, আইন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোর সঙ্গে নিবিরভাবে কাজ করে। পাশাপাশি মামলার জট নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ভূমিকা না থাকলেও প্রত্যক্ষ ও কার্যকরী ভূমিকা, অসহায় ও গরিব বিচারপ্রত্যাশীদের আইনি সহায়তা (লিগ্যাল এইড) দেওয়ার মতো কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করতে হয়। এ ছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে নিয়োগসহ সম্পর্কিত কার্যক্রম, সারা দেশের আদালতগুলোয় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি নিয়োগে মুখ্য ভূমিকা রাখে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে বিচারাঙ্গনের অনেক স্তরে মাথাচাড়া দেওয়া দুর্নীতির বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে সংশ্লিষ্টদের। সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ মন্ত্রণালয়কে ঘিরে প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে তেমনি চ্যালেঞ্জও আছে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে, গত বুধবার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম কার্যদিবসে বিচার বিভাগের দুর্নীতি নিয়ে হুঁশিয়ারি দেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী। দায়িত্ব পালনে চ্যালেঞ্জ আছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণ অনেক আনন্দের। পাশাপাশি নিজের মধ্যে দায়িত্ববোধ কাজ করতে হবে। মানুষ যেভাবে দেখতে চাইবে, সেভাবেই আমরা এই মন্ত্রণালয়কে দেখতে চাই।’ দুর্নীতির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বিচারক শব্দটার সঙ্গেই সততার বৈশিষ্ট্য জড়িত। বিচারক সৎ-অসৎ এই জায়গায় আমি দেখতে চাই না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যাদের মনে হবে যে, চাকরির টাকায় সংসার চলে না, যাদের এই টাকায় পোষাবে না, তাদের চাকরি করার দরকার নেই। তারা ওকালতি করুক।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি কেউ মনে করেন যে, দুর্নীতি করে পার পাবেন, এটা এখানে পাবেন না। কেউ দুর্নীতি করলে তার বিরুদ্ধে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থাই নেব না, সঙ্গে একটি দুর্নীতির মামলাও দেওয়া হবে।’

দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতগুলোতে এখন ৪৭ লাখ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে অধস্তন আদালতেই দেওয়ানি ও ফৌজদারি প্রায় ৪০ লাখ। মামলার জটে বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় অসহায় বিচারপ্রত্যাশী। মামলার অনুপাতে এবং প্রয়োজনের নিরিখে বিচারক সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক আদালতেই বিচারকদের কর্মদিবসে টানা বিচারকাজ করার মতো এজলাস নেই। একই এজলাসে পালা করে বিচারকাজ করতে হয়। বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের বাজেটও হয় প্রয়োজনের তুলনায় কম। সব মিলিয়ে অবকাঠামোসহ নানা সংকট দূর করে বিচারপ্রত্যাশীদের নির্ভার করার মতো কাজগুলো করতে হবে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়কে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিচার বিভাগের অনেক সমস্যা। এ সমস্যার কারণ যখন যে সরকার ক্ষমতায় গেছে, তারা তাদের বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের অধিকার বা অনিষ্পন্ন মামলা নিয়ে তাদের আগ্রহ ছিল কম। তিনি বলেন, মামলার জট সবচেয়ে বড় সমস্যা। বছরের পর বছর আদালতে বিচারপ্রত্যাশীকে অযাচিত টাকা খরচ করতে হয়। বিচারক সংকট থেকে শুরু করে অবকাঠামো ইত্যাদি নানা সমস্যা রয়েছে। অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘বিচার বিভাগ নিয়ে সত্যিকার অর্থে একটি সুনির্দিষ্ট মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। যেখানে আইন ও বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্টরা থাকবেন। তারা মতামত ও পরামর্শ দেবেন। আমরা প্রত্যাশা করতে পারি যে, নতুন সরকার ও মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবে। যদি এটি করা না হয় তাহলে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হবে বলে আমি মনে করি না।’

বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে নির্বাহী বিভাগ তথা আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক বিভাগ থেকে বিচারাঙ্গনকে পৃথক করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তিন দশক ধরেই চলছিল নানা আলোচনা। গত বছরের ৩০ নভেম্বর বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি হয়। ফলে বিচার বিভাগের প্রায় সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব এখন থেকে পালন করবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। অর্থাৎ অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার সবকিছু এখন থেকে করবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। তবে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এখনো কোনো গেজেট জারি না হওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কাজ চূড়ান্তভাবে শুরু হয়নি। বিচার বিভাগ নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে চললে আইন ও বিচার বিভাগের ওপর চাপ কিছুটা কমবে বলে মনে করেন মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। পরে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি। সরকার পরিচালনায় আইনের প্রয়োজন হয়। সংসদ না থাকলে সঙ্গত কারণেই রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে অধ্যাদেশ জারি করে নতুন আইন, পুরনো অইনের সংশোধনী, আইনের পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হয় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসের কিছু বেশি সময়ে ১৩০ টির বেশি অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। ৯২টি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিদ্যমান আইনের সংশেধান এবং ৩৮টি নতুন অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের সংশোধন, সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবলায় অধ্যাদেশ, পৃথক বাণিজ্যিক আদালত স্থাপন, মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের সংশোধন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধ, শিশু ধর্ষণের মামলায় বিচারের জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন, আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত আইন রহিত করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ ও আইনের সংশোধনী আনা হয়েছে। আবার তড়িঘড়ি করে করা কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে এসব অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি কী হবে। যদিও সরকার তার চাহিদামতো জাতীয় সংসদের মাধ্যমে অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করতে পারে। আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব হাফিজ আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগের সরকারের আমলে অধ্যাদেশ কী করা হয়েছিল, সেগুলো বর্তমান সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। সরকারের নিজস্ব কি চিন্তা ভাবনা আছে, এটা তো এখনই বলা যাবে না। সরকার কোন আইনটি চায় কোনটি চায় না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নেবে।’