প্রয়োজনীয় জ্বালানির সংস্থান না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করায় উৎপাদন-সক্ষমতা এখন বেড়ে হয়েছে চাহিদার দ্বিগুণ। কিন্তু সেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি, অর্থ এবং অবকাঠামো তিন ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়ার চাপ।
সব মিলিয়ে দেশে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ করা নবনির্বাচিত সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা।
জ্বালানি খাতের এই সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের উচ্চব্যয়ের চুক্তি, আমদানিনির্ভর নীতি এবং দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উৎপাদন-সক্ষমতা বাড়লেও সেই তুলনায় ব্যয় বেড়েছে আরও দ্রুত, বিশেষ করে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের কারণে। ফলে বিদ্যুৎ খাতের লোকসান কয়েক গুণ বেড়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত সমস্যাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত দেড় দশকে উৎপাদন-সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে আরও দ্রুত। বিশেষ করে, ক্যাপাসিটি পেমেন্টের কারণে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হচ্ছে, এমনকি উৎপাদন না করলেও। এতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লোকসান কয়েক গুণ বেড়েছে।
সামনের দিনগুলোয় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে, কারণ জ্বালানি আমদানি বাড়াতে হলে ডলারের প্রয়োজন হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি, মুদ্রার দরপতন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামাও বড় ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট থেকে বের হতে হলে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন। স্বল্প মেয়াদে বকেয়া পরিশোধ, জ্বালানি আমদানির জন্য অর্থের জোগান, সিস্টেম লস কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি। দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বৃদ্ধি, উচ্চব্যয়ের চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন, জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রশ্নও সামনে আসছে। কিন্তু দাম বাড়ালে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পড়বে। তাই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিগত সরকারের আমলের অনেক বকেয়া, অনেক দেনা-পাওনা রয়েছে। আবার জ্বালানির বড় সংকট রয়েছে, যা আমদানি করতে হবে। সেজন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। সব মিলিয়ে খুব জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি ইম্পোর্ট করতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে অর্থ সংস্থানের মাধ্যমে আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, পুরনো বকেয়া কিছুটা দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রেখে তারপর বসে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা করা। অতীতের নানা অনিয়ম সামলে কীভাবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেতে পারে, সেজন্য সরকার সংকট সামলানোর পথ খুঁজে দেখছে।
লোডশেডিং ও গ্যাসসংকট : শীত বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। গত বছর এপ্রিল-মে মাসে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তখন প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছিল। এবার একই সময়ে চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হলেও পরিকল্পনায় আগেভাগেই কিছু লোডশেডিং ধরে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কারণ চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে জ্বালানি দরকার, এর বড় সংকট।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে দৈনিক ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, তারা সর্বোচ্চ ১০০ কোটি ঘনফুট দিতে পারবে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় দেওয়া হচ্ছে প্রায় ৮০ কোটি ঘনফুট। ফলে সামনের দিনগুলোয় লোডশেডিং ভোগাতে পারে।
শিল্প খাতে গ্যাসসংকট দীর্ঘদিনের। গৃহস্থালির লাখো গ্রাহক লাইনে গ্যাস না পেলেও নিয়মিত বিল দিচ্ছেন। রান্নার গ্যাস না পেয়ে এলপিজির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেই বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে।
ডিসেম্বর থেকে এলপিজি আমদানিতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫০ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার সম্প্রতি আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। পরে দাম কিছুটা কমলেও এখনো নির্ধারিত মূল্যের ওপরে রয়েছে। সরকার জানুয়ারিতে ১ লাখ ৬৭ হাজার টন এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। বাস্তবে এসেছে এক লাখ পাঁচ হাজার টন। ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ৮৪ হাজার টন আমদানির লক্ষ্য ধরা হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে।
দীর্ঘদিন অনুসন্ধানে অবহেলার কারণে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। প্রতিবছর উৎপাদন কমছে গড়ে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। একসময় প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হলেও তা নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিলিয়নের কাছাকাছি। বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুদ কমে যাওয়ায় উৎপাদন আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। যেসব ক্ষেত্র জাতীয় সরবরাহের বড় অংশ দিত, সেগুলোতেই উৎপাদন দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও দেশীয় উৎস থেকে সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হবে।
এই ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু আমদানি বাড়ানোর মতো অবকাঠামো সীমিত। নতুন এলএনজি টার্মিনাল, পাইপলাইন ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা নির্মাণ সময়সাপেক্ষ এবং বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন। ইতিমধ্যে কিছু প্রকল্প বাতিল হওয়ায় আগামী কয়েক বছরে আমদানি দ্রুত বাড়ানোর সুযোগ নেই। এমনকি অর্থ থাকলেও অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকলে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে এলএনজি আমদানি ব্যয়বহুল। দেশীয় গ্যাসের তুলনায় আমদানি করা গ্যাসের দাম বহু গুণ বেশি হওয়ায় বিপুল ভর্তুকি দিয়েও লোকসান সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাতেও একই চিত্র প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় বিক্রয়মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি। এতে ভর্তুকির পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে এবং আর্থিক চাপ তীব্র হচ্ছে।
পুরনো বকেয়ার পাহাড় : বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিপুল পরিমাণ বকেয়া। এই বকেয়া বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হিসাবে ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে তাদের। বেসরকারি কোম্পানিগুলো গত সাত-আট মাস ধরে বিদ্যুতের বিল পায়নি।
দেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন-সক্ষমতার ২৩ শতাংশের মতো। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলে-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট বা ২০ শতাংশের মতো। এর মধ্যে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সক্ষমতাই প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট।
বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলছেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে দীর্ঘদিনের বকেয়া বিল পরিশোধ না হলে গ্রীষ্মে ব্যাপক লোডশেডিং অনিবার্য।
তাদের হিসাবে, শুধু স্থানীয় আইপিপি মালিকদের বকেয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) গত ১০ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ৮ থেকে ১০ মাস টাকা না পেলে কোনো ব্যবসাই টিকে থাকতে পারে না। মুদ্রার দরপতন, ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা ইতিমধ্যেই হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এই অবস্থায় কেন্দ্র চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ওপর বকেয়া পরিশোধ করা হচ্ছে না।
এদিকে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানি তাদের বকেয়া পরিশোধের জন্য সরকারকে নানাভাবে চাপ দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠানটি বিদু্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে আদানির।
দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে আদানির বকেয়া পরিশোধের চাপ অনেক বেশি। সেটি সরকার এখন কীভাবে সামাল দেবে, তা দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পিডিবির বকেয়া একপর্যায়ে তিন মাসে নেমে এসেছিল। তবে গত বছরের জুলাই মাসের পর থেকে আর কোনো বিল পরিশোধ করেনি বলেও জানান বেসরকারি উদ্যোক্তারা।
দেশের বিদ্যুৎ-জ্বালানির এই সংকটের জন্য এ খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, ফসিল ফুয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এই বকেয়া ক্রাইসিস, আজকে এই মূল্যবৃদ্ধি, লুণ্ঠনমূল্য ব্যয়বৃদ্ধি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
এ থেকে উত্তরণের জন্য তার পরামর্শ হলো তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর দরকার নেই। তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিলে সাশ্রয় হবে ২৮-৩০ হাজার কোটি টাকা। তা দিয়ে কয়লা আনলে অনায়াসে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বর্তমান দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা সাত হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, বর্তমান সরকারের এই মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। সেজন্য সময়মতো অর্থ ছাড় দিতে হবে। এরপরও কিছু লোডশেডিং করতে হবে। সেক্ষেত্রে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতকে প্রাধান্য দিয়ে বাসাবাড়িতে রেশনিং করে লোডশেডিং দেওয়া যেতে পারে। এরপর বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের টেকসই সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।
আইএমএফের ভর্তুকি সমন্বয় করা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষায়, বর্তমানে ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে ভর্তুকি রয়েছে, সেটি সমন্বয় করতে হলে গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম অন্তত ৪ টাকা করে বাড়াতে হবে। সেটাও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এই মুহূর্তে করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে অযাচিত ব্যয় এবং গ্যাস ও অন্যান্য খাতের অপচয় কমিয়ে সাশ্রয়ী হতে হবে। তারপরও কিছু মূল্য বৃদ্ধি করা লাগবে ভর্তুকি সমন্বয়ের জন্য।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।