দরিদ্র পরিবারে স্বস্তি এনে দেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’

সরকার গঠনের পরপরই অন্যতম নির্বাচনী ওয়াদা ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরীক্ষামূলকভাবে ১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধন করা হবে। সুবিধাভোগীদের মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রথম মাসের নগদ সহায়তা বাবদ ২ হাজার ৫০০ টাকা পৌঁছে যাবে। শুরুতে সাড়ে ৬ হাজার পরিবারকে কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে।

দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে স্বস্তি দিতেই এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। অর্থনীতিবিশ্লেষক, মানবাধিকারকর্মীরা এই ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নকে সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণের মাস্টারকার্ড বলছেন। ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি সরকার কৃষক কার্ড চালুর কাজও শুরু করেছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কৃষক কার্ড-সংক্রান্ত সভাও হয়েছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, প্রথম মাসের নগদ সহায়তা ও পরীক্ষামূলক খরচ বাবদ ইতিমধ্যে প্রায় ২ কোটি ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে সরকার। পর্যায়ক্রমে সুবিধাভোগীর সংখ্যা দুই কোটিতে উন্নীত করা হবে। ফ্যামিলি কার্ড গাইডলাইনে বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটকে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রার কথা গাইডলাইনে বলা হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড হিসেবে রূপান্তর করার লক্ষ্যে কাজ করবে সরকার। এই অর্থ পরিবারের নারী সদস্য বা গৃহকর্ত্রীকে দেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মানবাধিকারকর্মী রাশেদা কে চৌধূরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় যেকোনো সহায়তা কর্মসূচিই কল্যাণকর উদ্যোগ। ফ্যামিলি কার্ড প্রক্রিয়াকেও সাধুবাদ জানাই। আর যেহেতু এই প্রকল্পে সরাসরি সুবিধাভোগী নারী, সে ক্ষেত্রে নারীর প্রতি ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। তবে নারীর প্রতি বা তার অবস্থানের সুযোগ অন্য কাউকে দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা স্বজনপ্রীতি না করে ন্যায়ের ভিত্তিতে কার্ড বিতরণ করা জরুরি। তবেই দ্রব্যমূল্য সংকটে নারীর নেতৃত্বে পরিবারগুলো সংকট কাটিয়ে উঠবে। তবে সরকার প্রথম কার্যদিবস থেকে এই প্রকল্প দ্রুত শুরু করে প্রমাণ করেছে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে দায় তৈরি হয়েছে।’

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, গ্রামীণ এলাকায় বসতভিটাসহ আবাদি জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ একর বা তার কম হওয়া এবং পরিবারের মাসিক আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র পরিবার নির্ধারণ করা হবে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এই কার্ডটি সরাসরি পরিবারের ‘মা’ বা ‘নারীপ্রধান’ সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে। তবে পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত সরকারি চাকরিজীবী বা পেনশনভোগী হলে, বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসা থাকলে অথবা গাড়ি বা এসি থাকলে এই সুবিধার আওতায় আসবে না বলে খসড়ায় বলা হয়েছে। ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিজড়া, বেদে ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবারগুলো এই তালিকায় অগ্রাধিকার পাবে বলে জানানো হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা প্রকল্প নিয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্পভিত্তিক সহায়তা দিয়ে সাময়িক সহায়তা হয় বটে; কিন্তু ব্যাপক অর্থে সহায়তা দিতে হলে দরিদ্র দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। নাগরিকদের স্বাবলম্বী হতে উৎসাহ দিতে হবে। ক্ষুদ্রঋণ অথবা এককালীন সহায়তা দিয়ে আয়ের সংস্থান তৈরি করতে হবে।’

সমাজকল্যাণ ও নারী এবং শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য করা হবে না। দলীয় স্বজনপ্রীতি করা হবে না। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সুবিধাভোগী বাছাই করতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রধান করে উপজেলা কমিটি, শহর কমিটি, ইউনিয়ন কমিটি, পৌরসভা কমিটি ও ওয়ার্ড কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে মাইকিং ও স্থানীয় ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের সচেতন করা হবে।

প্রথমে যে ১৪টি স্থানে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে ঢাকার কড়াইল বস্তি এলাকা, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার ৪ বা ৫ নম্বর ওয়ার্ড, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ৪ নম্বর ওয়ার্ড, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ১ বা ২ নম্বর ওয়ার্ড, বান্দরবানের লামা উপজেলার ২ বা ৩ নম্বর ওয়ার্ড, খুলনার খালিশপুর উপজেলার ১০ নম্বর ওয়ার্ড, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ১ বা ৪ নম্বর ওয়ার্ড, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ৫ বা ৬ নম্বর ওয়ার্ড, কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার ২ বা ৮ নম্বর ওয়ার্ড, নাটোরের লালপুর উপজেলার ১ নম্বর ওয়ার্ড, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ১ বা ২ নম্বর ওয়ার্ড এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর ওয়ার্ড।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে নির্বাচিত ওয়ার্ডে সরেজমিনে গিয়ে যাচাই-বাছাই করে সুবিধাভোগী চূড়ান্ত করা হবে। পরিবারগুলো হতদরিদ্র, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত এই চার শ্রেণিতে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে হতদরিদ্র এবং দরিদ্র পরিবারকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে। কারণ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবার এ সুবিধা নিতে চাইবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ফ্যামিলি কার্ড-সংক্রান্ত কমিটির সভা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা আনতে এবং অনিয়ম রোধে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি করছে সরকার। জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ভিত্তিতে প্রতিটি পরিবারের তথ্য এ ডেটাবেসে সংরক্ষিত থাকবে। ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনের জন্য আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি, একটি সচল মোবাইল নম্বরসহ কাগজগুলো সংগ্রহে রাখতে বলা হয়েছে। পাইলট কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর কার্যালয়, সরকারি ডেডিকেটেড অনলাইন পোর্টাল (যা চালুর প্রক্রিয়া চলছে) থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

ফ্যামিলি কার্ডের মতো কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’ চালু করছে সরকার। এ নিয়ে দ্রুতই পাইলট প্রকল্প শুরু হতে যাচ্ছে। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ‘কৃষক কার্ড’ চালুসংক্রান্ত একটি সভাও হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মতো কৃষক কার্ড দেওয়ার বিষয়েও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি।

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, নীতিগতভাবে বহু আগেই বিএনপি কৃষক কার্ড করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন বাস্তবায়নের জন্য প্রথম কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী। যত দ্রুত সম্ভব ফ্যামিলি কার্ডের মতো কৃষক কার্ডের পাইলট প্রকল্প শুরু হতে যাচ্ছে। কৃষক কার্ডের পাইলট প্রকল্প কবে নাগাদ শুরু হবে, সেটি এখনই চূড়ান্ত হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ও পরামর্শ হচ্ছে, যত দ্রুত সম্ভব এটা করা হবে।