‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারেক রহমান। এই ধারণাটি তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের মূল বিষয় যা গণতন্ত্র, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতীক। এর শেকড় রয়েছে তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে, যা সর্বজনীন ও বৈষম্যহীন দর্শন। এর ভিত্তিতে তারেক রহমান অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। যা রাষ্ট্র-রাজনীতি পুনর্গঠনের জন্য ৫১ দফার নির্বাচনী ইশতেহার, ৩১ দফা এবং ভিশন-২০৩০-এ যুক্ত রয়েছে। তারেক রহমান ছাড়া গত চব্বিশ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ‘সবার বাংলাদেশ’ কথাটি উচ্চারণ করেননি। তিনি তার বক্তব্য, লেখা, আলোচনা বা কোনো কাজ প্রসঙ্গে প্রায়ই বলেন আপনি, আমি, আমরা, সকলে মিলে করব। এই যে সকলে মিলে দেশ, সবার অধিকার সমান, সবার বাংলাদেশ এটাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির সংস্কৃতি। এটি তিনি তার চিন্তা ও দর্শনে কীভাবে ধারণ করলেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইতিহাসে ফিরে যেতে হবে। তারেক রহমানের পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সংমিশ্রণে হাজার বছরের যে রসায়ন, তা আবিষ্কার করে নাম দিয়েছিলেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। এই জাতীয়তাবাদের ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার চেতনা ও রাজনৈতিক দর্শন। তার মতে, ‘ভাষা যদি একটি ফুল হয়, ধর্ম আরেকটি ফুল। ভাষা-ধর্মের কোনো ফুলকে অস্বীকার করব না। কিন্তু ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, ভাষা বিদ্রোহ এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের বিভিন্ন ফুল নিয়ে যে তোড়া বেঁধেছি, এতে সব ফুল আছে, এটিই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে এর কোনো বিরোধ নেই; কিন্তু এটি শুধু আংশিক সংজ্ঞা। তাই আমরা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পুরো সংজ্ঞায় পরিচিত হতে চাই, একটি ফুল নয়, এবার একটি ফুলের তোড়া চাই।’
পিতার রাজনৈতিক দর্শন গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের জন্য মনেপ্রাণে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান এমন প্রশ্ন ছিল না। তাই স্বাধীন বাংলাদেশেও তথাকথিত সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু নিয়ে চিন্তার কোনো অবকাশ নেই। দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করবে, এটিই বিএনপির নীতি ও রাজনীতি। আমরা বিশ্বাস করি, দল-মত-ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার এবং নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার। বাঙালি-অবাঙালি, বিশ^াসী-অবিশ^াসী, কিংবা সংস্কারবাদী প্রত্যেক নাগরিকের একমাত্র পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। এই বাংলাদেশ আপনার, আমার, আমাদের সবার।’ ‘সবার বাংলাদেশ’ এই বক্তব্যের বা বাক্যটির দার্শনিক ভিত্তি বা সূত্র কী? এক্ষেত্রেও আমাদেরকে রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসের পাতা উল্টাতে হবে। স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র। গির্জা, বণিক শ্রেণি, বুর্জোয়া শ্রেণি, রাজতন্ত্রের শোষণ, দুঃশাসন, নিপীড়ন, বঞ্চনার দুর্ভোগ থেকে মুক্তির জন্য ফরাসির সাধারণ জনগণ (১৭৮৯-১৭৯৯) প্রায় ১০ বছর সংগ্রাম করেছেন। সামন্ততন্ত্র ও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, দার্শনিক, সশস্ত্রবাহিনী, জনতা মিলে বিজয় অর্জন করেন। জনগণের এই বিজয় ইতিহাসে ফরাসি বিপ্লব নামে খ্যাত। রাষ্ট্র চলবে মানুষের তৈরি আইনের দ্বারা রাজার তৈরি আইন বা ধর্মযাজকের আইন দিয়ে নয়, যে আইন মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রয়োগ করবেন। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলে মানুষ সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাদ দিতে পারবেন এবং নতুন প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন। অর্থাৎ জনগণই মূল, জনগণ নিজেরাই নিজেদের শাসন করবেন, নিজেদের জীবন মান উন্নয়নে নিজেরাই ভূমিকা পালন করবেন।
ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক রাজনীতি দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় আধুনিক রাষ্ট্র। ফরাসি বিপ্লবের আগে ও পরে তিনজন দার্শনিকদের জ্ঞানতত্ত্ব আধুনিক রাষ্ট্র-দর্শন ও রাজনীতিতে অবিস্মরণী ভূমিকা পালন করেন। তারা হলেন, জন লক (১৬৩২-১৭০৪), জঁ-জাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮), মন্তেস্কু (১৬৮৯-১৭৫৫)। ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর রুশ বিপ্লব সংগঠিত হয়। যা পৃথিবীর প্রথম সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। অবশ্য পরে নতুন গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী তারিখটি পড়ে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর। অক্টোবর বিপ্লব নভেম্বর বিপ্লব হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। লেনিনের নেতৃত্বে নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো সর্বহারা (শ্রমিক-কৃষক) শ্রেণির সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শোষণমুক্ত বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শোষিত মানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রামের জয়যাত্রা শুরু হয়। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপর্যয় ঘটলেও পৃথিবীর কয়েকটি রাষ্ট্রে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণের গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আর রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে সামাজিক গণতন্ত্র বা সামাজিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা তৈরি হলো। এখন আমরা বলতে পারি ‘সবার বাংলাদেশ’ বলতে তারেক রহমান বুঝিয়েছেন জনগণের বাংলাদেশ, সকলের বাংলাদেশ, একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ। সবার বাংলাদেশ হলে সেই বাংলাদেশে আর কখনো স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্টের জন্ম হবে না। ‘সবার বাংলাদেশ’কে প্রথমেই হতে হবে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। গণতন্ত্রের জন্য দেশকে বহুবার রক্ত দিতে হয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পর্যন্ত, সব গণআন্দোলনের জন-আকাক্সক্ষা ও অভিপ্রায় অনুযায়ী, এবার থামতে হবে সবাইকে। সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে, বহুদলীয় সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণতান্ত্রিক সমঝোতা ছাড়া গণক্ষমতায়নের দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব না। আমাদের প্রত্যেকের জীবন রক্ষা ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার অধিকার রয়েছে এবং সে জন্য জনগণের আকাক্সক্ষা ও অভিপ্রায় অনুযায়ী সব বিষয়ে মতামত প্রদানের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কখনো কারও গণতান্ত্রিক অধিকার অন্যায়ভাবে লঙ্ঘত হলে, তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দায়িত্ব অন্য সবার এবং আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের। যেখানে একজন মানুষ সবসময়ই ন্যায়বিচার চাইতে পারেন। সুতরাং আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের হতে হবে। গণতান্ত্রিক আইন, আদালত ও বিচারব্যবস্থা ছাড়া গণতন্ত্র অসম্ভব। এই অর্থে গণতন্ত্র হচ্ছে গণতান্ত্রিকভাবে গৃহীত আইনের শাসন। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ব্যতীত গণতান্ত্রিক রাজনীতির টেকসই বিকাশ সম্ভব না।
বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে একসাগর রক্তের বিনিময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, সব মত ও পথের মানুষের সঙ্গে আলোচনা, মতবিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সেই ধরনের কাক্সিক্ষত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতর থেকে সব ধরনের বৈষম্য দূর করে, জ্ঞানবিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ-মুখী এক মানবিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলবে। যেখানে মানুষ ধর্মবর্ণ-শ্রেণি-পেশানির্বিশেষে সবাই সম্প্রীতিমূলক স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে। স্বাধীনতা, সাম্য, বৈষম্যহীন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে, সেই স¦প্নে বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে? সত্যি হলো স্বাধীন একটা ভূখণ্ড ছাড়া জনগণের আর কোনো আকাক্সক্ষাই পূরণ হয়নি। বাংলাদেশকে একটি সুস্থির-শান্তিময় নাগরিক অধিকার সুরক্ষার দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দেশজুড়ে যেন আর কখনোই গুম, গুপ্তহত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নারী ও শিশুদের ওপর পৈশাচিকতা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, টাকা পাচারের মতো ঘৃণ্য বিভীষিকার পুনরাবৃত্তি না হয় সেই লক্ষ্যে অগ্রসর হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ হবে একটি ‘রইনবো ন্যাশন’ যেখানে সব জনগোষ্ঠী, মতাদর্শ ও সংস্কৃতির মানুষ নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে একটি অভিন্ন গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করবে। তার এই ধারণা কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি একটি মানবিক রাষ্ট্রদর্শন, যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রই হবে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি। অর্থাৎ পিতার রাজনৈতিক দর্শনকে আরও সমৃদ্ধ করে দেশ ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই তার লক্ষ্য। সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্র, যেখানে মানুষের বৈচিত্র্য কোনো বিভাজনের দেয়াল নয়, বরং একতার সেতুবন্ধন। এক সহনশীল ও সৌহার্দপূর্ণ সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা এক সঙ্গে বেঁধে রাখে একটি বৃহত্তর মানবিক বন্ধনে। এখানে মানুষ বিভক্ত নয় পরিচয়ে, বরং যুক্ত হয় মূল্যবোধে-শান্তি, ন্যায়বিচার ও সমঅধিকারের এক প্রাণবন্ত সমাজ, যেখানে প্রতিটি পরিচয় স্বতন্ত্র হলেও, তাদের মিলনেই গড়ে ওঠে একটি সুষম, সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ মানবিক রাষ্ট্র।
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র এমন একটি কাঠামো যেখানে সব নাগরিকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করা হয় এবং রাষ্ট্রের সব কার্যক্রমে তাদের সমান অংশগ্রহণ ও মর্যাদা থাকে। এখানে বৈষম্যের কোনো স্থান নেই, রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যক্তি ও সম্প্রদায় উন্নয়নের সমান অংশীদার। অর্থনৈতিক সুফল যেন সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে, তা নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং দারিদ্র্য দূরীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, নারী নেতৃত্বে ও অনগ্রসর জনগণের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনমান রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিবেশ রক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত। শিল্পায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি এখানে অগ্রাধিকার পায়। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক প্রতিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচি এমন এক ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যায়, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি সহাবস্থানে এগিয়ে চলে। বিশে^ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যেমন সুইডেন, নরওয়ে কিংবা কানাডা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের সফল উদাহরণ যেখানে সামাজিক সুরক্ষা, সমান অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশও এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও টেকসই রাষ্ট্র গঠনের পথে এগিয়ে যেতে পারে। তখন প্রতিটি নাগরিক উন্নয়নের সঙ্গী এবং সমান মর্যাদার অধিকারী হবে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
sk.rafiq1982@gmail.com