যশোরে ১২৫৭ সমবায় সমিতির নিবন্ধন বাতিল

যশোরে ১২৫৭টি নিষ্ক্রিয় সমবায় সমিতির নিবন্ধন বাতিল করেছে জেলা সমবায় কার্যালয়। ২০১৩ সাল থেকে নিরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকাসহ সমবায়বিধি লঙ্ঘন করায় সমিতিগুলোর নিবন্ধন বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৯টি সমিতির নিবন্ধন বাতিলের জন্য নোটিস দিয়েছে জেলা কার্যালয়। যাদের খাতা-কলমে অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে কার্যক্রম নেই।

জেলা সমবায় অফিসের তথ্য মতে, সমবায় অফিস থেকে বিআরডিবি ও প্রকল্পভুক্ত দুই ধরনের সমিতির রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়। যশোর জেলা সমবায় অফিসের নথিতে গত বছর এই দুই ধরনের সমিতির সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৯৯৪টি। এর মধ্যে প্রকল্পভুক্ত সমিতির সংখ্যা ১২৫৭টি। ২০১২ সালে এগুলোর নিবন্ধন নেওয়া হয়েছিল। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৩ সাল থেকেই এগুলোর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।

জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়ের পরিদর্শক শাদিমুজ্জোহা জানান, কৃষি, প্রাণী ও মৎস্য খাতের উন্নয়নে ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে জেলার ৮ উপজেলায় স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে ছোট ছোট দল ‘কমন ইন্টারেস্ট গ্রুপ’ (সিআইজি) গড়ে ওঠে। এর মধ্যে মনিরামপুরে ২৪৬টি, অভয়নগরে ১৩৬, বাঘারপাড়ায় ১২২, চৌগাছায় ১৫২, ঝিকরগাছায় ১৭৪, কেশবপুরে ১৩৭, সদরে ১৪১ ও শার্শায় ১৪৮টি। সে সময় এগুলো সমবায় দপ্তর থেকে রেজিস্ট্রেশন গ্রহণ করে। কিন্তু প্রথম থেকেই কার্যক্রমে গতি আসেনি।

যশোর জেলা সমবায় কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নিবন্ধিত সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা, আয়-ব্যয়ের হিসাব উপস্থাপন এবং অডিট করা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে এর নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য জানাতে হয়। এসব কার্যক্রম এক বছর বন্ধ থাকলে নিবন্ধন সরাসরি বাতিল হওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে ১২৫৭টি সমিতি এ নিয়ম মানেনি। তার পরও অপেক্ষা করতে থাকে জেলা সমবায় অফিস। একপর্যায়ে ২০২২ সালে অকার্যকর সমিতির তালিকা তৈরি করে বিভাগীয় কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।

এদিকে, গত জানুয়ারি মাসে জেলার ১৯টি নিষ্ক্রিয় সমিতির নিবন্ধন বাতিলের জন্য কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে জেলা কার্যালয়। এসব সমিতিও তিন থেকে আট বছর ধরে নিষ্ক্রিয় রয়েছে।

কেশবপুরের আনসার ভিডিপি সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির সভাপতি হুমায়ন কবির জানান, ২০০৫ সালের ১০ আগস্ট সমিতিটি নিবন্ধন নিয়ে প্রথম দিকে আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিল, ব্যবস্থাপনা কমিটি নবায়নসহ বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হলেও গত ৮ বছর ধরে নিষ্ক্রিয় রয়েছে। গত ২৬ জানুয়ারি নিবন্ধন বাতিলের জন্য তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস/দিয়েছে।

ভাল্লুকঘর দক্ষিণপাড়া সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির ম্যানেজার রেশমা খাতুন জানান, তাদের সমিতি ২০২০ সালের ১৩ জুলাই নিবন্ধন নেয়। প্রথম দিকে সদস্যরা আগ্রহের সঙ্গে সঞ্চয় জমা দিতেন। মিটিংয়ে আসতেন। একপর্যায়ে গতি কমে যায়। এখন পুরোপুরি বন্ধ। নিবন্ধন বাতিলের জন্য তাদের কারণ দর্শানোর চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

বাউশালা ঋষিপাড়া সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমিতির ম্যানেজার বিলাশী রানী দাস বলেন, ‘আমাদের একটা বড় আকাক্সক্ষা ছিল। দল গঠন করে অল্প অল্প করে সঞ্চয় করব। নিজেরা সাবলম্বী হব। সেই লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু বছর না ঘুরতেই সদস্যরা পিছুটান দেয়। কেউ মিটিংয়ে আসেন না। কেউ সঞ্চয় জমা দেয় না। এই অবস্থায় গত তিন বছর কোনো কার্যক্রম নেই।’

সমবায় কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নিবন্ধন দেওয়ার পর সমিতির দেখভালের দায়িত্ব পড়ে সমবায় অফিসের ওপর। নিষ্ক্রিয় থাকায় সমিতির কারো আর খোঁজ মেলে না। সংশ্লিষ্ট কেউ অর্থ তছরুপসহ অনিয়মে জড়ালে সমবায় অফিসকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এ ছাড়া নিয়ম অনুযায়ী সমিতির লভ্যাংশের ওপর তিন শতাংশ টাকা সরকারি কোষাগারে দিতে হয়। এ ক্ষেত্রেও সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

যশোর জেলা সমবায় কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নিবন্ধন বাতিলের জন্য গত জানুয়ারি মাসে যে ১৯টি সমিতিকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছিল তাদের কেউ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাব দেয়নি। ফলে তাদের নিবন্ধনও বাতিল করা হবে।