ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবারও মুখোমুখি হচ্ছে- তবে সরাসরি নয়, মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে। সুইজারল্যান্ডে তৃতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনার প্রাক্কালে দুই পক্ষই কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছে, কিন্তু বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক ইঙ্গিতে স্পষ্ট হচ্ছে- মাঠের বাস্তবতা এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) জেনেভায় পৌঁছান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। সেখানে তিনি ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির সঙ্গে বৈঠক করেন। আলবুসাইদি এই সংলাপের মধ্যস্থতাকারী। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) নির্ধারিত বৈঠককে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও পর্দার আড়ালে রয়ে গেছে গভীর মতপার্থক্য।
রওনা হওয়ার আগে আরাঘচি বলেন, একটি ‘ন্যায্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও সমতাভিত্তিক চুক্তি’ সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র চায় না, তবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার ছাড়বে না। এই বক্তব্যে ইরানের মূল অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত হলো- পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ নয়, বরং তার চরিত্র ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক।
আলোচনার আগের দিনগুলোতে ওয়াশিংটনের বক্তব্যে ছিল কড়া সুর। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অভিযোগ করেন, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। হোয়াইট হাউসে তিনি বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না এবং এ ধরনের প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমস্যা তৈরি করবে। প্রেসিডেন্ট কূটনৈতিক সমাধান চান, তবে প্রয়োজনে বিকল্প পথও খোলা আছে- এ কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ৩০ জনের বেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অভিযোগ- তারা ইরানের তেল বিক্রি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও অস্ত্র উৎপাদনে অর্থ জুগিয়েছে। অর্থাৎ আলোচনা চলার মাঝেই অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল অব্যাহত রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অশুভ পারমাণবিক অভিলাষ’ থাকার অভিযোগ তোলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কথা বলেন। ইরান এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং জানুয়ারির অস্থিরতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ‘বড় মিথ্যার’ পুনরাবৃত্তি। তিনি এই প্রচারণাকে ইতিহাসের কুখ্যাত প্রচারকৌশলের সঙ্গে তুলনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, জেনেভার আলোচনা মূলত পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে হবে। তবে তিনি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং দাবি করেন, তেহরান এসব ক্ষেপণাস্ত্রকে আন্তমহাদেশীয় পাল্লায় উন্নীত করার চেষ্টা করছে। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আলোচনার বাইরে রাখতে ইরানের অনড় অবস্থানকে তিনি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, ইরান চাইছে- নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বাস্তবে কার্যকর হবে এমন যাচাইযোগ্য নিশ্চয়তা। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়েও মতভেদ রয়ে গেছে। দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পর আরাঘচি জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য কিছু মৌলিক নীতিতে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে, তবে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
এই সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার। প্রথম দফা বৈঠক ৬ ফেব্রুয়ারি ওমানে, দ্বিতীয় দফা ১৭ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় অনুষ্ঠিত হয়। তৃতীয় দফা ঘিরে তাই প্রশ্ন- পূর্বের প্রাথমিক বোঝাপড়া কি এবার কাঠামোবদ্ধ চুক্তির দিকে এগোবে, নাকি আগের মতোই স্থবিরতায় আটকে থাকবে?
ইরান ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে তেহরান- যে পথ দিয়ে বিশ্ব তেলের বড় অংশ পরিবাহিত হয়।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ইরানি জাতির মর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থ সম্মানিত হলে তারা কূটনৈতিক টেবিলে থাকবে। তবে প্রতারণা, মিথ্যা তথ্য বা আলোচনার মাঝেই হামলার পুনরাবৃত্তি হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স জানিয়েছেন, উত্তেজনা বাড়লে জবাব দিতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত। শক্তির প্রদর্শনই প্রতিরোধের ভিত্তি- এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়েছে- এ দাবি করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের বক্তব্যে সেটিকে এখনো সক্রিয় হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে লক্ষ্যবস্তু হওয়া স্থাপনাগুলোর বর্তমান অবস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকেরা যাচাই করতে পারেননি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর বক্তব্যের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় নিজেদের কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে চাইছে। লক্ষ্য- ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা এবং পরবর্তী ধাপে আঞ্চলিক কার্যক্রম ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো। বিনিময়ে অর্থনৈতিক স্বস্তির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে চিত্রটি দ্বৈত- একদিকে কূটনৈতিক টেবিল, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক প্রস্তুতির ভাষ্য। দুই পক্ষই আপাতত আলোচনায় আছে, তবে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। তৃতীয় দফার সংলাপ সেই ব্যবধান কমাবে, নাকি অনিশ্চয়তাকেই আরও ঘনীভূত করবে- এখন সেদিকেই দৃষ্টি আন্তর্জাতিক মহলের।
সূত্র: আল-জাজিরা