ছেঁউড়িয়ার শান্তিনীড় লালন আখড়া

ছোটবেলা থেকে বইয়ে পড়েছি, গানে শুনেছি তার কথা। ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে...।’ সেই মানুষটার সাধনভূমিতে পা রাখার অনুভূতি একেবারেই আলাদা। কুষ্টিয়া শহর থেকে কুমারখালীর দিকে রওনা দিতেই দৃশ্যপট ধীরে ধীরে বদলে যায়। শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেছনে ফেলে গন্তব্য ছেঁউড়িয়া, যেখানে অবস্থিত লালন ফকিরের আখড়াবাড়ি। আখড়ার গেট পেরোতেই প্রথম যে জিনিসটা আমাকে ছুঁয়ে গেল, তা হলো এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি। মনে হলো, শহরের কোলাহল যেন এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। বাতাসে ধূপের হালকা গন্ধ, চারপাশে নিস্তব্ধতা, তবু সেই নিস্তব্ধতা একেবারে নীরব নয়। কোথাও একতারা বাজছে, কোথাও মৃদু কণ্ঠে গান ভেসে আসছে। যেন জায়গাটা নিজেই কথা বলে।

ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সাদা গম্বুজওয়ালা সমাধিসৌধ। এই সমাধিতেই শায়িত আছেন লালন শাহ। সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হলো, ইতিহাস এখানে কোনো দূরের বিষয় নয়; হাত বাড়ালেই যেন স্পর্শ করা যায়। সমাধির চারপাশে মানুষ নীরবে বসে আছেন। কেউ চোখ বন্ধ করে ধ্যান করছেন, কেউবা চুপচাপ বসে আছেন গভীর চিন্তায়। তাদের মুখে এক ধরনের প্রশান্তি, যেন তারা নিজের ভেতরের কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন।

সমাধির পাশেই বসেছিলেন এক বাউল। গায়ে সাদা পোশাক, কাঁধে গামছা, হাতে একতারা। আমি কাছে যেতেই তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘এইডা কি আপনের প্রথমবার আসা?’ কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক টান শুনে মনে হলো, জায়গাটা আমাকে আপন করে নিল। আমি মাথা নাড়তেই তিনি গান ধরলেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। তার কণ্ঠ খুব জোরালো নয়, কিন্তু গভীর। প্রতিটি শব্দ যেন ভেতরে গিয়ে লাগে। গান শেষ করে তিনি বললেন, ‘লালন কোনো ধর্মের কথা কয় নাই, মানুষ হওয়ার কথাই কইছেন।’ কথাটা শুনে চুপ করে রইলাম। সত্যিই তো, আমরা কত পরিচয়ে নিজেদের ভাগ করি! অথচ এখানে এসে বুঝলাম, মানুষের মানুষ পরিচয়টাই আসল।

আখড়াবাড়ি শুধু একটি সমাধিস্থল নয়; এটি এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এক কোণে কয়েকজন তরুণ-তরুণী বসে গান অনুশীলন করছে। তাদের একজন জানালেন, তারা ঢাকায় পড়াশোনা করেন, কিন্তু সময় পেলেই এখানে আসেন। শুনে মনে হলো, লালন কেবল অতীতের সাধক নন; তিনি আজও তরুণদের মনে বেঁচে আছেন।

আখড়ার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গড়াই নদী। বিকেলে নদীর ধারে গিয়ে বসেছিলাম। হালকা বাতাস বইছে, আকাশের রঙ ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। সূর্য ডুবতে ডুবতে নদীর পানিতে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। দূরে কোথাও আবার গান শুরু হয়েছে। সেই সুর ভেসে আসছে। মনে হলো, প্রকৃতি আর দর্শন এখানে আলাদা নয়; একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

হঠাৎ মনে পড়ল তার সেই বিখ্যাত গান, ‘জাত গেল জাত গেল বলে’। আজকের পৃথিবীতেও আমরা জাত, ধর্ম, পরিচয় নিয়ে কত বিভক্ত! অথচ এই আখড়ায় এসে বুঝলাম, মানুষ হিসেবে এক হওয়ার আহ্বানটাই ছিল তার মূল কথা। এখানে কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না তুমি কোন ধর্মের, কোন শ্রেণির, কোন পরিচয়ের? এখানে সবার একটাই পরিচয়, মানুষ!

সেদিন সৌভাগ্যক্রমে রাতে একটি ছোট সাধুসঙ্গ ছিল। চারপাশে মানুষ গোল হয়ে বসেছিল। মাঝখানে কয়েকজন বাউল। আলো খুব বেশি নয়। কয়েকটি বাতি আর প্রদীপের মৃদু আলোয় মুখগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। গান শুরু হলো ধীরলয়ে, তারপর ধীরে ধীরে তাল বাড়ল। একতারা, দোতারা, খমক সব মিলিয়ে এক অনন্য সুর।

গানের ফাঁকে একজন বললেন, ‘লালনরে বুঝতে হইলে বই পড়লেই হইবো না, অনুভব করতে হইবো।’ কথাটা শুনে মনে হলো, সত্যিই তো, আমরা অনেক কিছুই জানি কিন্তু কতটুকুই বা অনুভব করি? তার গান শুধু শোনার বিষয় নয়; সেটা অনুভবের, ভেতরে ধারণ করার বিষয়।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হচ্ছিল, সময় যেন ধীরে চলছে। শহরের ব্যস্ততা, মোবাইলের নোটিফিকেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাড়াহুড়ো সব যেন দূরে সরে গেছে। এখানে শুধু মানুষ, সুর আর এক ধরনের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি। মনে হচ্ছিল, নিজের ভেতরের শব্দগুলোও যেন ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে।

পরদিন সকালে আবার সমাধির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সকালের আলোয় জায়গাটা আরও শান্ত লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এই জায়গায় সময়ের কোনো তাড়া নেই। এখানে প্রতিটি মুহূর্ত ধীর, স্থির।

ফিরে আসার সময় বাসের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বসেছিলাম। রাস্তা এগোচ্ছে, দৃশ্য বদলাচ্ছে, মানুষ উঠছে-নামছে। কিন্তু আমার ভেতরে তখনো বাজছে একতারা। মনে হচ্ছিল, ছেঁউড়িয়ার সেই নীরব আকাশটা যেন এখনো মাথার ওপর ঝুলে আছে।

লালনের আখড়ায় একদিন কাটিয়ে বুঝলাম, সেখানে আসা মানে শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান দেখা নয়। সেটা যেন নিজের সঙ্গে দেখা করা। আমরা প্রতিদিন কত তাড়াহুড়োয় থাকি পড়াশোনা, কাজ, প্রতিযোগিতা, প্রমাণ করার চেষ্টা। কিন্তু সেখানে গিয়ে মনে হয়, এত কিছুর ভেতরেও আসল প্রশ্নটা খুব সহজ আমি কেমন মানুষ?

লালন ফকির কোনো ধর্মের গ-িতে নিজেকে বাঁধেননি; তিনি মানুষকে খুঁজেছেন মানুষের ভেতরে। তার দর্শন বইয়ের পাতায় যতটা বোঝা যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি অনুভব করা যায় সেই আখড়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে। সেখানে গেলে বোঝা যায়, মানবতা কোনো তত্ত্ব নয়; এক অনুশীলন, এক সাধনা।

শহরে ফিরে এসে যখন আবার কোলাহল আমাকে ঘিরে ধরল, তখনো মনে হচ্ছিল, আমি যেন একটু বদলে গেছি। হয়তো খুব বড় কোনো পরিবর্তন নয়, কিন্তু ভেতরে একটা প্রশ্ন জেগে উঠেছে। আমরা কি সত্যিই মানুষ হতে পেরেছি? হয়তো উত্তর একদিনে পাওয়া যাবে না। কিন্তু লালনের আখড়ায় একদিন কাটালে অন্তত খোঁজটা শুরু হয়। আর সেই খোঁজই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। লালনের আখড়ায় একদিন হয়তো সময়ের হিসাবে খুব ছোট একটি অধ্যায়। কিন্তু অনুভূতির হিসাবে, তা এক দীর্ঘ যাত্রার শুরু।

লেখক : শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, পঞ্চম সেমিস্টার, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া