গাইবান্ধায় ৮৮ শতাংশ ইটভাটাই অবৈধ

গাইবান্ধায় পরিবেশ আইন অমান্য করে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ইটভাটা। প্রশাসনের নির্দেশ ও বিধিবিধান কোনো কিছুই তোয়াক্কা করছেন না ভাটার মালিকরা। এসব ভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে গাছের গুঁড়ি। কৃষি জমির টপ সয়েল দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ইট। প্রশাসন অভিযান চালালেও কিছুদিন পর আবার চালু করছে ভাটা। চলতি বছর জেলায় মোট ১২৫টি ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে ইট। এর মধ্যে মাত্র ১৫টি ভাটার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে। বাকি ১১০টিই অবৈধ।

পরিবেশ আন্দোলন গাইবান্ধার আহ্বায়ক ওয়াজিউর রহমান বলেন, ‘ভাটার কালো ধোঁয়া, ইট পোড়ানোর গন্ধে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। এগুলো উচ্ছেদে প্রশাসনের উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অবৈধ ভাটা উচ্ছেদে বাধা কোথায়, তা বোধগম্য নয়।’

ইটভাটা স্থাপন আইন প্রসঙ্গে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও গাইবান্ধা নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী ইটভাটা স্থাপনের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক। লাইসেন্সের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। সেই বিধান লঙ্ঘনের দায়ে দুবছর কারাদ- বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ- হতে পারে। তিনি আরও বলেন, আইন থাকলেও বাস্তবে পরিবেশ অধিদপ্তরকে অবৈধ ভাটা উচ্ছেদে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। দু’চারটি লোক দেখানো অবৈধ ভাটা উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবিরের অভিযোগ, প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশেই ভাটা মালিকরা এসব চালাচ্ছেন। তা না হলে এত অবৈধ ভাটা চলছে কীভাবে?

তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের গাইবান্ধা জেলা কার্যালয়ের সরকারি পরিচালক উত্তম কুমার বলেন, ‘অবৈধ ভাটা উচ্ছেদে ম্যাজিস্ট্রেট পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে সারাদেশে তিনজন মাত্র ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করেন। তারপরও জেলায় এ পর্যন্ত অবৈধ ৬টি ইটভাটা থেকে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।’

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর গাইবান্ধা জেলা কার্যালয় থেকে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের দেওয়া একটি নথিতে শুধু জেলায় ১২৫টি বৈধ ও অবৈধ ইটভাটার নাম ও ঠিকানা দেওয়া আছে। জেলা প্রশাসনকে দেওয়া আরেকটি নথিতে জেলায় ১২৫টি বৈধ ও অবৈধ ইটভাটা মালিকের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর সংবলিত তালিকা দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নথি থেকে জানা গেছে, গাইবান্ধার সাতটি উপজেলার মধ্যে ভাঙনকবলিত ফুলছড়িতে কোনো ইটভাটা নেই। বাকি ছয়টিতে ১২৫টি ইটভাটা রয়েছে। বর্তমানে চলমান ১২৫টি ভাটার মধ্যে মাত্র ১৫টির পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আছে। বাকি ১১৫টিই অবৈধভাবে চলছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে খামার ধুবনী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয় ভবন থেকে আনুমানিক ৮০ ফুট দক্ষিণে গড়ে উঠেছে মের্সাস জে.এস ব্রিকস নামের একটি ইটভাটা। সেখানে অবৈধভাবে কাঠ ব্যবহার করে ইট পোড়ানো চলছে। শ্রমিকদের কেউ ইট তৈরি করছেন, কেউ কাঁচা ইট পোড়ানোর স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন। বিদ্যালয় মাঠ ঘেঁষে কাঁচা ইট রাখা হয়েছে।

খামার ধুবনী গ্রামের কৃষক মজিবুল ইসলাম বলেন, ‘ভাটার কালো ধোঁয়ায় এলাকার উঠতি বোরো ধানের বীজতলা ও জমির ফসল নষ্ট হচ্ছে। গাছপালার পাতা লালচে হয়ে গেছে। ভাটায় মাটি বহনের কারণে গ্রামের জমিসংলগ্ন রাস্তায় উঁচ-নিচু গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।’

একই চিত্র দেখা গেছে, ওই উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের কিশামত সর্বানন্দ গ্রামে গড়ে ওঠা কেএনএম ইটভাটায়। এই ভাটাটিও কিশামত সর্বানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। ভাটার মালিক মোখলেছুর রহমান অবৈধভাবে ভাটা চালানোর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

কিশামত সর্বানন্দ থেকে আধা কিলোমিটার দূরে একই গ্রামে গড়ে উঠেছে এফকেএম ইটভাটা। ভাটা থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে খাজেমুল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও আলহাজ ইমান উদ্দিন জামিউল হাফিজিয়া মাদ্রাসা। ভাটার কারণে পাঠদান ব্যাহত এবং পরিবেশ দূষিত হচ্ছে বলে জানালেন মাদ্রাসা দুটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তবে ভাটার মালিক মহিউল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি।

গাইবান্ধা জেলা ভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফুল মিয়া বলেন, ‘অবৈধ ভাটার কারণে বৈধ ভাটা মালিকরা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা অবৈধভাবে ইট পুড়িয়ে কম দামে বিক্রি করছেন। আমরাও তাদের বৈধভাবে ইট পোড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছি।’

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ করা হবে।’