দিবস পালনে সীমাবদ্ধ না থাকুক নারী ভাবনা

নারীদের অধিকার আদায়, সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে ও নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ৮ মার্চ পালন করা হয় ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা কিছু নারী শিক্ষার্থীর কাছ থেকে নারী দিবসে তাদের ভাবনা তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত সুলতানা

কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের অবদান ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে তাদের অংশগ্রহণ দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকারি, বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীরা এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সমান কাজের জন্য অসম মজুরি, পদোন্নতি ও নেতৃত্বের সুযোগ সীমিত, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এবং নিরাপত্তাহীনতা নারীদের পূর্ণ অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগে বাধা দেয়। বেসরকারি খাতে, একই কাজের জন্য পুরুষরা গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১৬,০০০ টাকা আয় করেন, নারীরা প্রায় ১২,৬০০ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশ কম। গার্মেন্টস ও অন্যান্য শিল্প খাতে নিরাপত্তা সমস্যা এবং যৌন হয়রানি নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রকে করে তোলে ঝুঁকিপূর্ণ। এসব প্রতিবন্ধকতার প্রতি লক্ষ রেখে নারী হিসেবে আমি চাই, নারী দিবস কেবল স্লোগান, সভা, সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নারীরা পাবে সব জায়গায় নিরাপত্তা। ধর্ষণ, খুন, যৌন হয়রানির ভয়ে কোনো নারী পিছিয়ে পড়বে না এটাই হোক নারী দিবসের প্রত্যাশা।

তনিমা বিনতে হোসেন

শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, অর্থনীতি বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

নারী হোক আত্মশক্তিতে বলীয়ান

‘বিশ্বের যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’ কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত দুটি কবিতার চরণ। সত্যি একটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু সময়ের প্রেক্ষিতে এই নারীসমাজ নির্যাতন, অন্যায়, অবিচারের শিকার হন। নারী কখনো শিশু হয়ে ধর্ষণের শিকার, মেয়ে হয়ে ইভটিজিংয়ের শিকার, বউ হয়ে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের শিকার। এ রকম প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন ও সহিংসতার মাঝে কাটায় তাদের জীবন। তথাপি নারী ঘরে-বাইরে বিভিন্ন ধরনের বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। নারী অধিকার নিয়ে যদিও বিভিন্ন সংগঠনের কাজ চলমান তবুও নারী কোনো না কোনোভাবে নিপীড়িত।

স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা তাদের অধিকার নিয়ে সরব হলেও বিবাহিত মেয়েদের জীবনে নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন ও অত্যাচার। তারা পড়াশোনা শেষ করতে পারে না, শ্বশুরবাড়িতে নিজের স্বত্বাকে হারিয়ে ফেলে। স্বকীয়তা বলতে নিজের কিছু থাকে না। বিবাহিত মেয়েদের জীবনে স্বামী সংসার আর শ্বশুরবাড়ি ছাড়া কিছু থাকে না, বিশেষত গ্রামীণ পরিবেশে। নারী দিবসের লক্ষ্য হওয়া উচিত নারীকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান এক আলোর মশালে রূপান্তর করা। নারী শিক্ষা, দক্ষতা, কারিগরি ও বিজ্ঞানের আলোকে জীবনকে এমনভাবে গঠন করবে যেন সব কুসংস্কার, অবিচার, প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে আত্মপরিচয়ে পরিচিত হতে পারে।

মারুফা আক্তার

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ইসলামিক স্টাডিজ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শ্রমবাজারে নারী-পুরুষ সমান সুবিধা চাই

বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজে নারী সামাজিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক মুক্তি পাচ্ছে বটে, তবে বৈষম্যের শিকার যে হচ্ছে না তা নয়। নারীর ক্ষমতায়নের বুলি আওড়ানো হলেও প্রতিনিয়ত নারীরা অপমান, অবহেলার শিকার হচ্ছে। সমতা ও ন্যায্যতার টানাপড়েনে স্থিমিত হচ্ছে নারীর স্বাভাবিক বিকাশ। সফল নারীর রঙিন চাদরে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে প্রান্তিক নারীর মৌলিক, সামাজিক, আর্থিক চাহিদাকে। এখনো প্রতিনিয়ত অবমূল্যায়িত হচ্ছে মা নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের, নারীর কাজ করার সুযোগ। অনেক সময় আবার নারীরাই হয়ে উঠছে নারীদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা। তবে জন্মগতভাবেই নারী আত্মমর্যাদা, শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। প্রদীপের নিচের অন্ধকারকে সঙ্গে নিয়েই প্রতি ফাল্গুনে বিনাশ করছে অবরুদ্ধতাকে। আজকের নারী দিবসে প্রত্যাশা হোক নারীদের জন্য নিত্য সুন্দর ও সমতার পৃথিবী যেখানে প্রতিটি দিনই নারী-পুরুষ সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে।

ছিদরাতুল মুনতাহা

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

নারীরা হয়ে উঠুক

নেতৃত্বের প্রাণকেন্দ্র

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনের পর বিশ্বব্যাপী নারী অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ নারীরা রাজনীতিতে ভূমিকা রাখছেন। তথাপি বৈশি^ক ও বাংলাদেশের রাজনীতিক প্রেক্ষাপটে আশানুরূপ সাফল্য অর্জন হয়নি। না হওয়ার পেছনে আছে নারী নেত্রীদের নিয়ে অনলাইন ট্রল সংস্কৃতি, বুলিং, যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ। নারীদের এমন অবমাননার ফলে সমাজে সহিংসতা বাড়ছে, ফলস্বরূপ নারীরা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। কিন্তু নারীদের নেতৃত্বের মূল ধারায় নিয়ে আসা না গেলে তাদের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একজন নারী হিসেবে আমি চাই শুধু ‘নারী দিবস’ পালনে সীমাবদ্ধ না থেকে নারীরা রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করবে এবং নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলবে।

জান্নাতুল আদন আরশি

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ইসলামিক স্টাডিজ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়