কর্নেল (অব.) নাজমুল হুদা খান
পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল, ঢাকা
রমজানে আমরা সংযম, সহিষ্ণুতা, আনুগত্য, আত্মত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির অনুশীলন করে থাকি। রোজা রেখে শারীরিকভাবে রোজার নানাবিধ সুফলও ভোগ করি। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, রমজান মাসে রোজা রাখার ফলে দেহের বহু ইতিবাচক উন্নতি ঘটে, যা রক্তের গুকোজ নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন কনিকাগুলো ইতিবাচক পরিবর্তন, শরীরে ক্ষতিকারক চর্বি হ্রাস, ওজন কমানো ও নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বৃদ্ধি এবং আয়ুষ্কাল বাড়া ইত্যাদি ।
শরীরের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ ও কমানো : রোজা থাকার ফলে আমাদের রক্তে চর্বি, ফ্যাটি অ্যাসিড, কোলেস্টেরল ইত্যাদির পরিমাণ কমে যায়। ফলে রক্তে চর্বির শতকরা হার ও ঐইঅ১প র পরিমাণ হ্রাস পায় এবং দেহে গ্লুকোজ বা সুগারের পরিমাণও কমে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ : স্থূলতা আমাদের দেহের বহুবিধ অসংক্রামক রোগের কারণ। এ ছাড়া আমাদের চলাফেরা ও জীবনযাত্রায়ও ব্যাঘাত ঘটায়। রোজা দৈহিক স্থূলতা হ্রাস করে। সাধারণত রোজার ২য় বা ৩য় সপ্তাহেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শরীরের ওজন কমতে দেখা যায়।
দেহে ক্ষতিকারক চর্বি হ্রাস ও উপকারী চর্বি বৃদ্ধি : রমজান মাসে আমাদের রক্তের ক্ষতিকারক চর্বির উপাদান লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (LDL) এবং ভেরি লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিনের পরিমাণ হ্রাস পায়। অন্যদিকে আমাদের শরীরের সুরক্ষায় কাজ করে এমন চর্বির উপাদান যেমন হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (HDL)-এর পরিমাণ বেড়ে যায়।
রক্তের বিভিন্ন কণিকা ও উপাদানে পরিবর্তন : রোজা রাখার ফলে রক্তের বিভিন্ন কণিকা যেমন লোহিত কণিকা, শ্বেত কণিকা, অনুচক্রিকা প্রভৃতির বৃদ্ধি ঘটে। যা আমাদের দেহকে সুরক্ষিত করে।
হৃদরোগের লক্ষণ কমে : রোজা রক্তের সুগার, চর্বি, ইনসুলিন, হৃদকম্পন, নাড়ির গতি লক্ষণীয়ভাবে হ্রাসের কারণে হৃদপিন্ডের বহুবিধ রোগ কমে এবং রক্তচাপ ও মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। যা দেহের রক্তনালি, রক্ত ও হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন রোগ কমাতে সহায়তা করে।
ক্যানসারের ঝুঁকি কমায় : রোজা শরীরের বিভিন্ন ক্ষতিকারক উপাদান কিংবা ক্যানসার উৎপত্তির অনুঘটক যেমন সাইটোকাইনগুলো, লেপটিন, এডিপোনেকাটিন প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্যানসার উৎপত্তির সম্ভাবনাকে হ্রাস করে।
প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় : রোজা একদিকে রক্তের বিভিন্ন রক্ত কণিকার পরিমাণ বাড়িয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে; অপরপক্ষে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান IL-6, IL-IB, TNF-α, লিস্ফোসাইট, মনোসাইট প্রভৃতি কমায়, ফলে পরোক্ষভাবে আমাদের দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটে।
স্নায়ুরোগ প্রতিরোধ : রোজা স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকরী কোষ নিউরনগুলোকে সুরক্ষিত রাখে, ফলে বিভিন্ন ধরনের স্নায়ুতন্ত্রের রোগ যেমন : আলঝেইমার রোগ, স্ট্রোক প্রভৃতি রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পায়।
আয়ুষ্কাল বাড়ায় : রমজানে আমাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। দৈহিক সুস্থতা, মানসিক প্রশান্তি, সামাজিক কল্যাণ ও আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধতার মাধ্যমে আমাদের শারীরিক সুস্থতার উন্নতি ঘটে এবং আমাদের আয়ুষ্কাল বাড়াতে ভূমিকা রাখে।