ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতার প্রধান সেনানী

ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা ও ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’র কারিগর ছিলেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ১৯৮৯ সালে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন। এর আগে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে তিনি ইরানে ইসলামি বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন। রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে গঠিত সরকারে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট’ (ধর্মীয় নেতাদের একটি পর্ষদ) আলি খামেনিকে সংবিধান সংশোধন করে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচন করে। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন আদর্শগত শক্তি। তিনি ইরানে পাহলভি রাজতন্ত্র অবসানের বিপ্লবে নেতৃত্ব দেন। আর আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ছিলেন ইরানের এমন এক নেতা, যিনি ইরানের সামরিক ও আধা সামরিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালীরূপে গড়ে তুলেছিলেন। আর এ ব্যবস্থা শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরক্ষা নিশ্চিতই নয়, বরং দেশের সীমার বাইরে গিয়েও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। মোদ্দাকথা হলো, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আজকের ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতার কারিগর। ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহতের পর আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আলজাজিরার বিশ্লেষণে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জীবনীর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়।

গতকাল রবিবার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে আলি খামেনির নিহত হওয়ার খবর জানানো হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আলি খামেনি নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল। প্রসঙ্গত, সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে দেশটির রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তার বাবা একজন খ্যাতনামা মুসলিম নেতা ছিলেন। তিনি (বাবা) পার্শ্ববর্তী দেশ ইরাকের আজারবাইজানি জাতিসত্তার ছিলেন। আজারবাইজানি পরিবারটি প্রথমে উত্তর-পশ্চিম ইরানের তাবরিজে বসবাস শুরু করেছিল, পরে মাশহাদে চলে আসে। শহরটি ধর্মীয় তীর্থযাত্রীদের পছন্দের স্থান। সেখানে আলি খামেনির বাবা একটি আজারবাইজানি মসজিদের প্রধান ছিলেন। আলি খামেনির মায়ের নাম খাদিজা মিরদামাদি। খামেনি নিজের মাকে পবিত্র কোরআন ও অন্যান্য বইয়ের একজন একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। খাদিজা মিরদামাদি তার সন্তানের মধ্যে সাহিত্য ও কবিতার প্রতি ভালোবাসা জন্মিয়েছিলেন। পাহলভি রাজবংশের শাসনের বিরুদ্ধে তার আন্দোলনে যোগ দেওয়াতেও মায়ের সমর্থন ছিল। চার বছর বয়সে আলি খামেনি লেখাপড়া শুরু করেন। তিনি পবিত্র কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং মাশহাদের প্রথম ইসলামি বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি হাইস্কুল শেষ করেননি, এর পরিবর্তে ধর্মতাত্ত্বিক স্কুলে ভর্তি হন এবং সে সময়ের খ্যাতনামা ইসলামি প-িতদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তার শিক্ষকদের মধ্যে তার বাবা এবং শেখ হাসেম গাজভিনিও ছিলেন।

পরবর্তী বছরগুলোয় আলি খামেনি নাজাফ ও কোমের আরও খ্যাতনামা শিয়া উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলোয় লেখাপড়া করেন। কোমে কয়েকজন প্রসিদ্ধ মুসলিম ধর্মীয় নেতার সঙ্গে আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যাদের একজন ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। শাহ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণে রুহুল্লাহ খোমেনি তরুণ ধর্মশিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। মূলত এভাবেই আলি খামেনি ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। শাহ শাসনের সময় তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হন। তাকে ইরানের প্রত্যন্ত শহর ইরানশাহরে নির্বাসিত করা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে শাহ পাহলভি শাসনের বিরুদ্ধে ইসলামি বিপ্লব শুরু হলে তিনি বিক্ষোভে অংশ নিতে ফিরে আসেন।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হয়। ইরানে পাহলভি রাজবংশের শাসনের অবসান হয়। নতুন শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় চলে আসেন আলি খামেনি। তিনি ১৯৮০ সালে অল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সূচনার পর তিনি ইসলামি বিপ্লবী বাহিনীর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮১ সালটি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। সেবার অল্পের জন্য তিনি গুপ্তহত্যার চেষ্টা থেকে প্রাণে রক্ষা পান। তবে তার ডান হাতটি অকেজো হয়ে যায়। ওই বছরই তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনিই ইরানের প্রথম ধর্মীয় নেতা, যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু ইসলামি বিপ্লবকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। খোমেনি মৃত্যুর আগেই তার উত্তরসূরি হিসেবে বহু বছর আগে থেকে নির্ধারিত আয়াতুল্লাহ হোসেইন আলি মন্তাজেরিকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। আলি মন্তাজেরি ১৯৮৮ সালে বন্দিদের গণমৃত্যুদ- দেওয়ার সমালোচনা করেছিলেন। পরে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত একটি পরিষদ খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। বিশ্লেষকদের মত, দীর্ঘ যুদ্ধ, এর সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেওয়ার কারণে ইরানিদের ভেতর এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। এতে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আলি খামেনির অবিশ্বাস আরও গভীর হয়। আর এই মনোভাবই আলি খামেনির দশকব্যাপী শাসনের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। তার এই ধারণাকে দৃঢ় করেছিল যে, ইরানকে সব সময় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থায় থাকতে হবে। এই ধারণা ও মনোভাব থেকেই তিনি দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) আধা সামরিক বাহিনী থেকে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। পরে এই বাহিনী পুরো অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তারে কেন্দ্রীয় ভূমিকা গ্রহণ করে।

কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখেও যাতে ইরানের স্বনির্ভরতা বাড়ানো যায়, সেজন্য ইরানের ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নিয়েছিলেন আলি খোমেনি। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িত হওয়ার বিষয়ে গভীরভাবে সন্দিহান থাকতেন। তার প্রতিরক্ষামূলক নীতি প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে, এমন অভিযোগের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতেন। শুধু তাই নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের ভেতরেও তার শাসন মারাত্মক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়।

২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলকে ‘ছলনা’ দাবি করে বহু মানুষ সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। আলি খামেনি কঠোর হাতে ওই বিক্ষোভ দমন করেন। ২০২২ সালে তেহরানে মাসা আমিনি নামের এক কুর্দি তরুণীর পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরান জুড়ে তীব্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। কয়েক মাস ধরে ওই আন্দোলন চলে। সেই আন্দোলনও কঠোর হাতেই দমন করেছিলেন আলি খামেনি।

৩৭ বছরের শাসক জীবনে আলি খামেনি সবচে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন চলতি বছর জানুয়ারিতে। ডলারের বিপরীতে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়ালের ব্যাপক দরপতন ঘিরে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে ব্যবসায়ী ও দোকানদারেরা বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে পুরো দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, বিক্ষোভকারীরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের ডাক দেন।