শ্রমিক অসন্তোষের ঝুঁকিতে ১৮০ কারখানা

আসন্ন ঈদ কেন্দ্র করে ১৮০টি তৈরি পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে ঈদের আগেই ৯ মার্চের মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি (বেতন) এবং ১২ মার্চের মধ্যে বোনাস (উৎসব ভাতা) পরিশোধের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে খাতসংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

শিল্প-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শিল্পাঞ্চলগুলোয় ৯ হাজার ৪০৩টি কারখানার মধ্যে গত বছর কোরবানি ঈদের সময় ২৮৭টি তৈরি পোশাক কারখানা বকেয়া বেতন দিতে পারেনি, যা ওই সময় শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। এ বছর ঈদুল ফিতরে অন্তত ১৮০টি তৈরি পোশাক কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ না হওয়ার আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।

জানা গেছে, ঈদ ঘনিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত ৭৪৭টি কারখানা শ্রমিকদের জানুয়ারি মাসের বেতন দিতে পারেনি। এর মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানা ৩৫৭টি। আবার ১৪৯টি কারখানার রয়েছে, যাদের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। ফলে এসব কারখানায় শ্রম অসন্তোষ তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) ৯৪তম সভা ও তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতবিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (আরএমজিবিষয়ক টিসিসি) ২৩তম সভায় এসব বিষয় বলা হয়। সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সভায় দেশের সার্বিক শ্রম পরিস্থিতি পর্যালোচনা, তৈরি পোশাক খাতে শ্রম অসন্তোষ নিরসন ও আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কলকারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং ছুটি মঞ্জুর বিষয়ে আলোচনা হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত উপদেষ্টা মাহদী আমিন। সঞ্চালনায় ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া।

সভায় ঈদের আগেই শ্রমিকদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন-বোনাস পরিশোধের দাবি জানিয়েছে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা। সেই সঙ্গে মার্চ মাসের সম্পূর্ণ বা অর্ধেক আগাম বেতন দেওয়ার দাবি জানান তারা। সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে ছুটি দেওয়ার অনুরোধও করেন তারা। ঈদে দূরপাল্লার পরিবহন ভাড়া বেড়ে যায়। এটি নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়। এ ছাড়া নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসে উন্নীত করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়।

সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়ে সভায় টিসিসি সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও যেন শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে না হয়। বেতন ঠিক সময়ে পরিশোধ করলে শ্রমিকদের আর রাস্তায় নামতে হবে না।

সভায় নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সর্বশেষ সাত মাস ধরে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে। গত ডিসেম্বর, জানুয়ারি মাসের বেতনই অনেক মালিক দিতে পারেননি। এতে বোঝা যাচ্ছে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। এ অবস্থায় মার্চ মাসের ১৫ দিনের বেতন দেওয়ার দাবি অবাস্তব।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, এক বছর ধরে শিল্প-কারখানাগুলো অনেক খারাপ অবস্থায় পড়েছে। এই পরিস্থিতি বিভিন্ন প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। সবাইকে এ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, দেশ এবং বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিত মাথায় রেখে কোনোমতেই যেন শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি না হয়, তাই বেতন-ভাতা সঠিক সময়ে পরিশোধ করতে হবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এক মাসও হয়নি। ফলে পুরোনো সমস্যা সমাধানে সরকারকে একটু সময় দিতে হবে। তাই এ বছর ঈদের সময় কোনো আন্দোলন না করার জন্য শ্রমিক নেতাদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, তৈরি পোশাকশ্রমিকদের জন্য রেশনের কথা বলা হচ্ছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা ফ্যামিলি কার্ডের কাজ দ্রুত আগাচ্ছে। এটি নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে কিছুটা হলেও উপকার করবে। তৈরি পোশাক খাতেও এমন বিকল্প কিছু করা যায় কি না দেখা হবে।

সমাপনী বক্তব্যে মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষকে সমন্বয় করে কাজ করার আহ্বান জানান আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ঈদের সময় জনভোগান্তি যেন সৃষ্টি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঈদের আগে-পরে প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের কোনো কারণ ছাড়া লে-অফ বা ছাঁটাই করা যাবে না।

সাত কর্মদিবসের মধ্যে বেতন পরিশোধের নির্দেশ দিয়ে আরিফুল হক বলেন, আগামী সাত কর্মদিবসের (৯ মার্চ) মধ্যে যেন শ্রমিকদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন দিয়ে দেওয়া হয়। আর ঈদের বোনাস যেন ১২ মার্চের মধ্যে দেওয়া হয়। আর মালিক-শ্রমিক আলোচনার ভিত্তিতে কোনো কারখানা চাইলে মার্চ মাসের অর্ধেক বেতন দিতে পারে। তবে সেটি কারখানার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া শ্রম আইন অনুসারে কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটির বিষয়টি ঠিক করবে।