তিন দিন আগেও দলের গোলকিপিং কোচ মাসুদ আহমেদ উজ্জ্বল বারবার একটা কথাই বলেছিলেন, ‘আমাদের দলে তিনজন গোলকিপার। আমরা তিনজনকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুত করছি।’ গত কয়েক বছর ধরেই নারী জাতীয় দলের তেকাঠীর বিশ্বস্ত সৈনিক রূপনা চাকমা। এশিয়ান কাপের মতো বড় আসরে উজ্জ্বল কেন অন্যদের কথা বলেছিলেন সে রহস্য উন্মোচিত হয়েছে মঙ্গলবার। সিডনিতে এশিয়ান কাপের অভিষেকে বাংলাদেশ একাদশে রূপনার জায়গা হয়নি, খেলেছেন তাকেই আদর্শ মেনে চলা মিলি আক্তারের। পিটার বাটলার এই ঝুঁকিতেও উতরে গেছেন দারুণভাবে। কোচের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন মিলি, পোস্টের সামনে তার দৃঢ়তায় বিপর্যয় ঘটেনি। বরং চীনের মতো পরাশক্তির কাছে স্রেফ ২-০ গোলের হারের পরও মাথা উঁচু করে মাঠ ছেড়েছেন বাংলাদেশের মেয়েরা।
প্রথম এশিয়ান কাপ খেলতে এসে অনেক প্রথমের সঙ্গে পরিচয় ঘটছে বাংলাদেশের মেয়েদের। মিক্সড জোনের ব্যাপারটার সঙ্গেও তারা সেভাবে পরিচিত নন। কাল ম্যাচ শেষে তাই মিক্সড জোনে প্রথম এসে ধন্দে পড়ে গেলেন ফুটবলাররা। ক্যাটওয়াক করার মতো প্রথমে শুধু হেঁটে গেলেন, সাংবাদিকদের ডাকে কেউই সাড়া দিলেন না। পরে বুঝিয়ে দেওয়ার পর অবশ্য কথা বলেছেন মিলি থেকে শুরু করে অনেকেই। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শুরুতেই মিলি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন দলের কোচদের প্রতি, বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন কোচ উজ্জ্বলের নাম, ‘প্রথমে ধন্যবাদ দেব আমাদের কোচিং স্টাফদের। উনাদের জন্যই হয়তো পেরেছি নিজের পারফরম্যান্সটা দেখাতে। উজ্জ্বল স্যারের কথা বিশেষভাবে বলব, তিনিই আমাকে এই পর্যায়ে খেলতে প্রস্তুত করেছেন।’
এত বড় ম্যাচের আগে সবাই ভেবেছিলেন রূপনাই থাকবেন পোস্টের দায়িত্বে। তবে মিলি জানালেন, তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে সুযোগটা পাবেন, ‘আমি এটা অনেক আগে থেকেই জানি। যখন লিগ খেলেছি, তখন থেকে আমি বুঝতে পেরেছি আমি খেলব চীনের বিপক্ষে।’ তাতেই বোঝা গেল চীনা ঝড় থামাতে শতভাগ প্রস্তুতি নিয়েই নেমেছেন। তাই সিনিয়র দলে অভিষেকেও সেভাবে ঘাবড়ে যাননি মিলি, ‘জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ তো, তাই প্রথমে একটু ভয় কাজ করছিল, পরে ঠিক হয়ে গেছে। কনফিডেন্স নিয়ে খেলছি অনেক। তবে যে গোলটা প্রথম খেলাম, সেটা আমাদের ভুলের জন্য হয়েছে, ভয়ের জন্য না।’
এই ম্যাচেও জাদুকরী এক গোল করে ফেলতে নিয়েছিলেন ঋতুপর্ণা চাকমা। বাংলাদেশের বাঁ পায়ের জাদুকর প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে চেষ্টা করেছিলেন, যা চীনের কিপার অবিশ্বাস্যভাবে রুখে দেন। গোলটা না হওয়ায় আফসোস আছে ঋতুর, তবে তারচেয়েও বেশি আছে চীনের মতো দলের সঙ্গে লড়াকু পারফরম্যান্সের গর্ব, ‘আমরা খুব ভাগ্যবান যে চীনের মতো দলের সঙ্গে খেলতে পেরেছি। তারা ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন এবং বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা আছে। এমন শক্তিশালী দলের সঙ্গে খেলতে পেরে আমরা অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আর ওই গোলটা হলে আমার জীবনের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে মনে রাখতাম।’
দলের পাশাপাশি রক্ষণভাগের নেতৃত্বে ছিলেন আফঈদা খন্দকার। চীনের সঙ্গে বিপর্যয় রুখে দিয়ে এই সেন্টারব্যাক ভীষণ খুশি ধন্যবাদ দিয়েছেন মাঠে আসা সমর্থকদের। এই পারফরম্যান্সে স্বপ্ন আরও বড় হয়েছে বললেন আফঈদা, ‘(এই ম্যাচ) অবশ্যই শক্তি জোগাবে। প্রথম ম্যাচ চীনের সঙ্গে ছিল, চিন্তায় ছিলাম ওদের সঙ্গে কীভাবে খেলব, কীভাবে লড়াই করব। যেহেতু ওদের সঙ্গে লড়াই করতে পেরেছি, ইনশাল্লাহ আমরা উত্তর কোরিয়া, উজবেকিস্তানের সঙ্গেও পারব।’ চীনের কাছে দ্বিতীয় গোল হজমে কিছুটা দায় আছে আফঈদার। সেটা স্বীকার করে বললেন, ‘আক্ষেপ শুধু একটাই। দ্বিতীয় গোলটা, যেহেতু আমার পাশ থেকেই ছিল, আমি যদি ঠেকাতে পারতাম, তাহলে আমার এই আক্ষেপটা থাকত না।’
বাটলার অভিষেকের সুযোগ করে দিয়েছিলেন সুইডেন প্রবাসী আনিকা রানিয়া চৌধুরীকেও। বদলি হয়ে শেষ দিকে নেমে চেষ্টা করেছেন। এমন ম্যাচে বাংলাদেশের জার্সি পরতে পেরে গর্বিত তিনিও, ‘আমরা খুব ভালো একটি ম্যাচ খেলেছি এবং প্রথম ৩০ মিনিট আমরা খেলাটা খুব ভালোভাবে ধরে রেখেছিলাম। তারা (চীন) বেশি শক্তিশালী। ভীষণ গতিশীল। তবে আমরা লড়াই চালিয়ে গেছি এবং আমার মনে হয় ২-০ গোলে হারও আমাদের জন্য খুব ভালো পারফরম্যান্স।’
শিষ্যদের কথাতেই নিশ্চয় বুঝে নিচ্ছেন সংবাদ সম্মেলনে কতটা উচ্ছল ছিলেন কোচ পিটার বাটলার। দলের পারফরম্যান্সে ভীষণ গর্বিত কোচ বলেন, ‘চীনকে অভিনন্দন আমাদের হারানোয়। তারা এশিয়ার সেরা দল। কখনো মনে হয়েছিল খেলাটা একপেশে করে ফেলবে তারা। তবে আমরা হাল ছাড়িনি। খেলার আগে মেয়েদের বলেছিলাম নিজেদের সেরাটা দিতে। আমি জানি তোমরা যা দিতে পারবে তা আমাদের দাও এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলো। তোমরা যেমন, তেমনই থাকো এবং আমরা যা, সেটাই দেখাও।’
যোগ করেন, ‘আমরা এখানে রক্ষণাত্মক হয়ে বসে থাকতে বা বলির পাঁঠা হতে আসিনি। আমি সেভাবে কোচিং করাই না। আমার দলও সেভাবে খেলুক তা আমি চাই না। আমার মনে হয় আজ রাতে মেয়েরা দুর্দান্ত ছিল। সত্যিই কিছু ভালো মানের খেলোয়াড় এবং একটি শক্তিশালী বেঞ্চ সমৃদ্ধ একটি চমৎকার দলের বিপক্ষে তাদের দারুণ প্রচেষ্টা ছিল এটি।’
দুদিন বিশ্রামের পর বাংলাদেশকে দিতে হবে উত্তর কোরিয়া পরীক্ষা, যারা মঙ্গলবার আগের ম্যাচেই উজবেকিস্তানকে হারিয়েছে ৩-০ ব্যবধানে। সে ম্যাচ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত বি গ্রুপের
তৃতীয় দল বাংলাদেশ। এটাই বা কম কীসের!