জাপানের আইচি-নাগোয়া শহরে এশিয়ান গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে ১৯ সেপ্টেম্বর। কিন্তু তার আগেই আজ থেকে শুরু হচ্ছে ফুটবল ডিসিপ্লিনের খেলা। প্রথম দিনেই মাঠে নামবেন মারিয়া মান্দা-ঋতুপর্ণারা। আর শুরুর দিনেই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জাপানের ওসাকার নাগাই স্টেডিয়ামে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে বাংলাদেশের এশিয়ান গেমস অভিযান। বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টায় শুরু হতে যাওয়া ম্যাচটিতে ফলাফলের চেয়ে নিজেদের সামর্থ্য যাচাই, অভিজ্ঞতা অর্জন এবং ইতিবাচক পারফরম্যান্সকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলার।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়ালে দেশের ফুটবলের কঙ্কালসার চেহারাটা বারবারই সামনে চলে আসে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে বাংলাদেশ নারী দলের কোচ পিটার বাটলারের কথাতেও ফুটে উঠল সেই রূঢ় বাস্তবতা। রবিবার ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কোচ বাস্তবতার মাটিতে পা রাখার পাশাপাশি বড় মঞ্চের সুযোগ উপভোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন শিষ্যদের। ফিফা র্যাংকিংয়ে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ব্যবধানটা যে অনেক, সেটি স্বীকার করেই তরুণ ফুটবলারদের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ইংলিশ এই কোচ। জাপানের অবকাঠামোর প্রশংসা করার পাশাপাশি নিজ দলের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন বাটলার। তিনি বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া দলটিতে অত্যন্ত মানসম্পন্ন খেলোয়াড় রয়েছে। তাদের রয়েছে পর্যাপ্ত ফান্ড ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। বছরের পর বছর ধরে ধারাবাহিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির মধ্য দিয়ে তাদের ফুটবল আজকের পর্যায়ে এসেছে।’ এরপরই বাংলাদেশের নারী ফুটবলের বাস্তব চিত্রটি সামনে আনেন তিনি, ‘আমাদের বাস্তবমুখী হতে হবে। আমাদের দেশে তো মেয়েদের নিয়মিত কোনো লিগই নেই!’
বাংলাদেশের জন্য উত্তর কোরিয়া অবশ্য নতুন কোনো প্রতিপক্ষ নয়। চলতি বছরের মার্চে এএফসি নারী এশিয়ান কাপে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়ে একই দলের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে ঋতুপর্ণা চাকমাদের ৫-০ গোলে হারিয়েছিল কিম জং উনের দেশ। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও সেই শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
এবার এশিয়ান গেমসের এফ-গ্রুপে বাংলাদেশের অন্য দুই প্রতিপক্ষ দক্ষিণ কোরিয়া ও মিয়ানমার। তিন দলই ফিফা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের ওপরে। ফলে গ্রুপপর্বে বাংলাদেশের জন্য কাজটা যে সহজ হবে না, তা স্পষ্ট। তবে মিয়ানমারের বিপক্ষে বাংলাদেশের সুখস্মৃতিও আছে। গত বছর এশিয়া কাপ বাছাইয়ে তাদেরই মাঠে ২-১ গোলে জয় পেয়েছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। তবে বাটলার এখনই ফলাফলকে প্রধান লক্ষ্য বানাতে চান না। ২৩ সদস্যের দলে অভিজ্ঞ মারিয়া মান্ডা, মনিকা চাকমা ও ঋতুপর্ণা চাকমাদের পাশাপাশি জায়গা পেয়েছেন একঝাঁক তরুণ ফুটবলার। মৌমিতা, নবীরন, উন্নতি, আনিকা ও আইরিনদের মতো তরুণদের বড় মঞ্চে পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে কোচের। বাটলারের কথা, ‘ম্যাচের ফলাফল যাই হোক, তরুণদের সামনে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে শেখা ও নিজেদের উন্নতি করাই গুরুত্বপূর্ণ। এই বড় মঞ্চ থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করা, শেখা এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের আরও প্রস্তুত করাই আমার মূল লক্ষ্য।’
উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে নির্দিষ্ট কোনো খেলোয়াড়কে আলাদা করে আটকানোর পরিকল্পনাও নেই বাটলারের, ‘একজনকে ঘিরে পরিকল্পনা করলে অন্য খেলোয়াড়রা ফাঁকা জায়গা কাজে লাগাতে পারে।’ বরং প্রতিপক্ষের সামগ্রিক শক্তি ও সংগঠিত ফুটবল কাঠামোর প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন তিনি।
দুই দলের ফুটবল কাঠামোর পার্থক্য নিয়েও বাস্তববাদী বাটলার। কোচ বলেন, বাংলাদেশ ও উত্তর কোরিয়ার নারী ফুটবলের বর্তমান অবস্থান ‘দুই ভিন্ন জগতের’ মতো। তাই এই ম্যাচে বাংলাদেশের কাছ থেকে অবাস্তব প্রত্যাশা না রেখে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার ওপরই জোর দিচ্ছেন তিনি। তবে সূত্রে জানা গেছে, দলের ডিফেন্ডার নবীরন খাতুন ইনজুরিতে ভুগছেন। আজকের ম্যাচে তাকে নাও পেতে পারেন কোচ বাটলার।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের মেয়েদের এটি দ্বিতীয় অংশগ্রহণ। এর আগে ২০২৩ সালে চীনের হাংজুতে অনুষ্ঠিত ওই আসরে গ্রুপপর্বের সব ম্যাচেই হেরেছিল নারী দল। এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল উপহার দিতে চায় তারা। উত্তর কোরিয়ার পর ১৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কোরিয়া এবং ২১ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের বিপক্ষে খেলবে বাংলাদেশ। গ্রুপের সেরা দুই দল সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে উঠবে। পাশাপাশি তিন গ্রুপের সেরা তৃতীয় হওয়া আরও দুটি দলও শেষ আটে জায়গা পাবে। তাই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য মিয়ানমারের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি জিতে তৃতীয় হয়ে পরের রাউন্ডের সম্ভাবনা তৈরি করা।
সব মিলিয়ে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য কঠিন হলেও মূল্যবান এক পরীক্ষা। বাটলারের কাছে জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় বিষয়, তরুণদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ এবং ভবিষ্যতের জন্য বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন।
ফলাফলের চেয়েও বড় মঞ্চের চাপ সামলানোর দিকেই বেশি নজর এই ইংলিশ কোচের। তিনি যোগ করেন, ‘পরিস্থিতি কতটা কঠিন হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র বিভ্রান্তি নেই। তবে এই কঠিন চ্যালেঞ্জের মাঝেও আমরা খেলাটি উপভোগ করতে চাই। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো এই বড় মঞ্চের সুযোগগুলো থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করা, শেখা এবং নিজেদের ফুটবলের উন্নয়ন ঘটানো।’