অসুস্থ ও মুসাফিরের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ

ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ইসলামের প্রতিটি বিধানে রয়েছে গভীর মানবিক বোধ ও মহানুভবতা। বিশেষ করে, অসুস্থতা কিংবা দীর্ঘ সফরের ক্লান্তির কারণে মহান আল্লাহ বান্দাদের জন্য বেশ কিছু ফরজ বিধানে সহজতা দিয়েছেন। জীবন ও স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা বিধান করা শরিয়তের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তাই বিশেষ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রোজা রাখার কঠিন ব্রতকে শিথিল করে পরবর্তী সময়ে তা পূর্ণ করার যে অবকাশ দেওয়া হয়েছে, তা মূলত বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর অনন্য অনুগ্রহ। অসুস্থ, অক্ষম ও মুসাফিরের জন্য এই ছাড় অত্যন্ত প্রশান্তিদায়ক।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘রোজা নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের (এক মাস), তবে তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে, অন্য সময় এর সমপরিমাণ সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আর এটা যাদের অতিশয় কষ্ট দেয়, তাদের কর্তব্য হচ্ছে, এর পরিবর্তে ফিদইয়া অর্থাৎ একজন অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান করা। যদি কেউ আরও বেশি দান করে, এটা তার পক্ষে আরও অধিক কল্যাণকর। আর রোজা পালন তথা রোজা রাখাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণকর যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা বাকারা ১৮৪)

এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা অসুস্থ ও সফররত ব্যক্তিকে এ সুযোগ দিয়েছেন, যদি সে রমজান মাসে রোজা পালনের ফলে রোগ বেড়ে যাওয়া বা মৃত্যুর আশঙ্কা বোধ করে অথবা সফরে অসুবিধা এবং কষ্টের সম্মুখীন হওয়ার ভয় থাকে, তবে সে অসুস্থ অবস্থায় ও সফরের দিনগুলোয় রোজা ভঙ্গ করবে এবং এর পরিবর্তে নিষিদ্ধ দিনগুলো ব্যতিরেকে অন্যদিনগুলোয় সেগুলোর কাজা করবে। আয়াতে অতিশয় কষ্ট বলতে বোঝানো হয়েছে, অতি বার্ধক্য বা এমন চিরস্থায়ী রোগ, যা সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম, তার জন্য রোজা না রেখে ফিদইয়া অর্থাৎ একজন অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভিমত হলো, রোজা স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি করে না, বরং শরীর ও মনের উন্নতি লাভে সহায়ক। পেপটিক আলসার, ডায়াবেটিক, হৃদরোগী, বাত-ব্যথার রোগীরাও সরাসরি রোজায় উপকার পান।

তবে আল্লাহতায়ালা অনুগ্রহ করে কিছু মানুষের জন্য বেশি কষ্ট হলে রোজা ছাড় দিয়েছেন, তারা এ সময়ে রোজা না রেখে অন্য সময়ে তা পূর্ণ করতে পারেন। এর মধ্যে অসুস্থ ও সফররত ব্যক্তি অন্যতম। কারণ কাজের প্রয়োজনে অনেকের ছুটে যেতে হয় একস্থান থেকে অন্যস্থানে। অনেক সময় সফরের কারণে রোজা রাখা খুব কষ্ট হয়ে যায়। তাই আল্লাহতায়ালা অসুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে সফররত ব্যক্তির ওপর রোজা রাখার বাধ্যবাধকতাকে কিছুটা শিথিল করেছেন। তাদের ওপর রোজা রাখা বা না রাখাকে তাদের ইচ্ছা ও পছন্দের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।

এ থেকে বোঝা যায়, সফরকালে রোজা রাখাটা জরুরি কোনো বিষয় নয়। তবে কোরআন-হাদিসের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, সফরকালে রোজা রাখার বিষয়টিকে ইচ্ছা ও পছন্দের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কারণ হলো সফরকারীর কষ্ট দূর করা। আর এই ছেড়ে দেওয়া মানে একেবারে ছেড়ে দেওয়া নয়। রমজান মাসে সফর বা অন্য কোনো কারণে যে কয়টি রোজা রাখা সম্ভব হয়নি, রমজানের পর অন্য যেকোনো সুবিধাজনক সময়ে তা আদায় করতে হবে। আর যদি সফরকারী কোনো ব্যক্তি মনে করে, সফরকালে রোজা রাখলেও তার কোনো অসুবিধা হবে না, তাহলে সে রোজা রাখতে পারবে এবং এটাই হবে তার জন্য অতি উত্তম।

ইসলামি স্কলারদের মতে, মুসাফিরের জন্য সফর অবস্থায় রোজা না রাখার সুযোগ আছে। তবে বেশি কষ্ট না হলে রোজা রাখাই উত্তম। আর অস্বাভাবিক কষ্ট হলে রোজা রাখা মাকরুহ। এ অবস্থায় রোজা না রেখে পরে কাজা করে নেবে। (রদ্দুল মুহতার ২/৪২১)

আর সফর অবস্থায় নিয়ত করে রোজা রাখা শুরু করলে তা ভাঙা জায়েজ নয়। কেউ ভেঙে ফেললে গুনাহগার হবে। তবে কাফফারা দিতে হবে না। শুধু কাজা করবে। (রদ্দুল মুহতার ২/৪৩১)

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ মুসলিম কাউন্সিল