পটুয়াখালীর বাউফল পৌরসভার প্রকৌশলী আতিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে নকশা আটকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। চাকরির শুরু থেকে প্রায় ১৮ বছর ধরে একই উপজেলায় রয়েছেন এই প্রকৌশলী। ২০০১ সালে বিএনপি সময় চাকরীতে যোগদান করলেও পরবর্তিতে বনে যান আওয়ামী লীগের সমর্থক। কিন্তু ৫ আগস্টে পর আবারও বোল পাল্টে অন্য সংগঠনের কর্মী হওয়ার চেষ্টা অব্যহত রেখেছেন। সে চেষ্টায় তিনি সফল হবেন হয়তো কিন্তু স্থানীয়দের দাবি ইঞ্জিনিয়ার আতিকের অপসারণ।
জানা গেছে, ইঞ্জিনিয়ার আতিকুল ইসলাম ২০০১ সালে চাকরীতে যোগদান করেন। যোগদানের ২৫ বছরে মধ্যে বাউফল পৌরসভাতেই, প্রায় ১৮ বছর কর্মরত আছেন। পৌরসভার বিল্ডিং প্ল্যানিংয়ের অনুমোদনের দায়িত্ব তার হাতে। কিন্তু বাহিরের কোন আর্কিটেকচারের করা নকসা পাশ হয় না বলে অভিযোগে রয়েছে। বিধান রয়েছে প্ল্যান অনুমোদন প্রক্রিয়ার সাথে পৌরসভার কর্মকর্তাবৃন্দ কোন ভাবেই জড়িত থাকতে পারবেন না। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ইঞ্জিনিয়ার আতিকের মাধ্যমে নকসা পাশ করাতে বাধ্য করা হয় গ্রাহককে। না হলে প্ল্যান পাশ করাতে পারেন না ভবন নির্মাণ মালিকগন।
তাছাড়া নিজের করা প্ল্যান পাশ করাতে গুণতে হয় মোটা অংকের টাকা। ভবন নির্মাণের জন্য আবেদন ফি ১ হাজার টাকা, ৫ শত বর্গফিট একটি একতলা বিশিষ্ট ভবনের জন্য ২ হাজার টাকা এবং পরবর্তী প্রতি বর্গফিটের জন্য ২ টাকা করে সরকারী ভাবে জমা দিতে হয়। পৌরসভা কর্তৃক নির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও গ্রাহককে ২গুণ, তিনগুণ ক্ষেত্রবিশেষ তারচেয়েও বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।
নিয়ম রয়েছে প্রতি তিন মাস অন্তর বিল্ডিং প্লানিং কটিমির সভা করতে হবে। কিন্তু ২৪ সালের ৫ আগষ্টের আগে ১টি সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি। ৫ আগষ্টের পর দেড় বছরে মাত্র ২টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক শক্তি কাজে লাগিয়ে নিজেই নিজের মত করে তার দপ্তর পরিচালনা করে আসছেন গত ১৯ বছর।
অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের সাথে আতাত করে একই উপজেলায় বহু বছর কর্মরত রয়েছেন। একজন কর্মকর্তা এত বছর একই উপজেলায় কর্মরত থাকতে পারেন কিনা সে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন মাধ্যমে প্ল্যান করার কারণে বর্তমানে পৌরসভা ইঞ্জিনিয়ারের কাছে ২৫-৩০টি প্ল্যান পেইন্ডিং রয়েছে। পৌরসভার শুরু থেকেই ভবন নির্মাণের নকশা বাধ্যতামূলক। এসুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার আতিক। ভবন নির্মাণ মালিকদের কাছ থেকে নানা তালবাহানা পাকিয়ে অনৈতিক ভাবে অর্থ হাতিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএননিসি) এর নিয়ম অনুসারে ডিজাইনকৃত প্রকৌশলী ওই সাইড সুপারভাইস বা দেখাশোনা করবেন এবং অঙ্গিকারনামা দিতে হবে। কাগজে কলমে সব ঠিক থাকলেও নকশা করা প্রকৌশলীরা বাউফল উপজেলায় কোনো দিন আসে নাই বা তারা চিনেনও না।
মুঠোফোনে কথা হয় প্রকৌশলী মো ফয়েজউল্লাহর সাথে। তিনি জানান, ইঞ্জিনিয়ার আতিক তাকে দিয়ে নকশার সকল কাজ করিয়ে থাকেন। প্ল্যানের তদারকি তারা করেন না। তিনি বাউফল উপজেলায় অসেননি এবং চিনেনও না।
ইঞ্জিনিয়ার নাঈম নামের অপর এক প্রকৌশলী জানান, তিনি আগে ইঞ্জিনিয়ার আতিকের সকল কাজ করতেন। বর্তমানে তিনি ভান্ডারিয়া পৌরসভায় কর্মরত রয়েছেন। কোন কাজের তদারকি তিনি বাউফলে এসে করেননি।
ইঞ্জিনিয়ার সঞ্জয় নামের পটুয়াখালীর আরেক প্রকৌশলী জানান, তাকে দিয়ে নামমাত্র পারিশ্রমিকে নকসার ডিজাইনের করাতেন। ইঞ্জিনিয়ার আতিক তাকে বলতেন, বাউফল পৌরসভার সকল নাগরিকের নকশার কাজ আতিক সাহের বিনামূল্যে করে থাকেন। তাই তাকে নামমাত্র পারিশ্রমিক পরিশোধ করতেন।
বাউফল উপজেলা ভিত্তিক স্থাপতি মো. শফিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, ইঞ্জিনিয়ার আতিকের বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ সত্য। আমি নিজে একজন ইঞ্জিনিয়ার। আমাদের করা কোন নকশার কাজের অনুমোদন দেয়া হয় না। আমি এর আগে পৌর প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছিলাম। পৌর প্রশাসক আমাদেরকে এক সাথে নিয়ে বসে সকল নকসা পাশ করার নির্দেশ দেন আতিক সাহেবকে। কিন্তু এর পরও সে আমাদের কোন নকশা অনুমোদন দেন না। বর্তমান ইউএনও মহোদয়ের কাছে অভিযোগ করলে তিনি কিছুটা তাড়িয়ে দেয়ার মত আচারণ করেছেন।
এবিষয়ে পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আল আমি বলেন, আমি ২০২৪ সালের আগস্টের তিনমাস আগে প্ল্যান অনুমোদনের জন্য দিয়েছি। এখনও অনুমোদন পাইনি। আমার কাছ থেকে কয়েক ধাপে মোট ৬০ হাজার টাকার বেশি নেয়া হয়েছে। টাকাও ফেরৎ দেয় না আর নকশা অনুমোদনও দেয় না।
পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সোহাগ বলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে প্ল্যান অনুমোদনের জন্য যাবতীয় সকল কাগজ-পত্র দিয়েছি কিন্তু কবে অনুমোদন হবে জানিনা। আমার কাছ থেকে ২৬-২৮ হাজার টাকাও নিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের একজন সরকারী কর্মকর্তা জানান, আমার কাছ থেকে ২৩ হাজার টাকা নিয়েছে নকশা অনুমোদনের জন্য। ১ বছর হয়ে গেছে এখনও অনুমোদন হয়নি। তার প্লানটি বাহিরের ইঞ্জিয়ার দিয়ে করিয়েছেন।
পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের নির্মাণ ভবন মালিক তাসলিমা বেগম বলেন, আমি বাহিরে একজন ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা নকশা তৈরি করেছি। প্রায় ৬ মাস হয়েছে অনুমোদন দিচ্ছে না। কাজ শুরু করতে মালামাল এনে রেখেছি অনুমোদনের কারণে কাজ শুরু করতে পারছি না। অনেক মাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
অভিযুক্ত প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি কোন অনিয়মের সাথে জড়িত নই। এমনকি জানুয়ারী পর্যন্ত কোন প্ল্যান পেইন্ডিং নেই। তিনি কোন প্ল্যানের সাথে জড়িত না বলেও জানান তিনি।
এবিষয়ে ডেপুটি ডিরেক্টর অব লোকাল গভার্নমেন্ট(ডিডিএলজি) জুয়েল রানা বলেন, পৌর প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। এর আগে আমরা তদন্ত করেছি তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ পাইনি। এক ব্যক্তি এক উপজেলায় ১৮/১৯ বছর থাকতে পারেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন এটি মন্ত্রনালয়ের বিষয়।