রোজার মাসে ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা একটি চরম নিষ্ঠুর ও পরিকল্পিত আগ্রাসন। যা মানবাধিকার, ন্যায়, আন্তর্জাতিক আইন এবং ধর্মীয় মর্যাদার প্রতি পুরোপুরি নগ্ন হস্তক্ষেপ। এটি শুধু ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে না, বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের নৈতিক ও ধর্মীয় অনুভূতিকে বিদ্ধ করেছে। শিশু, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলা, যার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি শতভাগ বর্বরতা এবং পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের পরিচয় বহন করে। যে দেশগুলো মুসলিম হওয়ার দাবি রাখে, তারা এ মুহূর্তে অবাক করা নীরব। এই নীরবতা শুধু অনিচ্ছা নয়, এটি তাদের নৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক দ্বিধা প্রকাশ করছে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, যখন মুসলিম দেশগুলো শক্তিশালী আগ্রাসীর কাছে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন সেই সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি নিরঙ্কুশভাবে তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিয়েছে। অদ্ভুত নীরবতা মুসলিম উম্মাহকে কলঙ্কজনক অবস্থায় ফেলেছে এবং একই সঙ্গে আগ্রাসীদের উৎসাহিত করেছে আরও উগ্রতা দেখাতে। সময় এসেছে মুসলিম বিশ্বের বিশেষ করে, নেতৃত্ব দেওয়া দেশগুলোর সক্রিয়, দৃঢ় ও সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার। না হলে এই আগ্রাসন কেবল ইরান নয়, পুরো মুসলিম উম্মাহর ওপর দীর্ঘমেয়াদি হুমকির কারণ হতে পারে।
ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা একটি নিখুঁত বৈশ্বিক আইনবিরোধী কাজ। এটি অসাংবিধানিক, যুদ্ধবিরোধী এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি উপেক্ষা করেছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যেভাবে শান্তি রক্ষা ও হামলা প্রতিরোধের নিয়ম করেছে, তার সঙ্গে এই ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত। এ হামলায় অন্যায় ও ক্ষমতার অপব্যবহার স্পষ্ট। যেকোনো মুসলিম দেশ এভাবে নীরব থাকলে, তাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবিকতার ওপর নির্দয় আঘাত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। রোজার মাসে শিশু, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের হত্যা কেবল রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ নয়, এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের নৈতিক ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার ওপর মারাত্মক বর্বর আঘাত। এটি শুধু সামরিক হিংসা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত মানসিক ও ধর্মীয় আক্রমণ। ইরানের স্বাভাবিক প্রতিরোধকে খাটো করার চেষ্টা করেছে কয়েকটি মুসলিম দেশ। ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এটিকে কিছু কিছু দেশে, এমনকি মুসলমানদের ধারক বাহক দাবি করা দেশে নিন্দার চোখে দেখা হচ্ছে, অথচ এটি স্বাভাবিক আত্মরক্ষার অংশ। আগ্রাসন এবং প্রতিরোধকে সমান মানদণ্ডে বিচার না করলে, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়। মুসলিম দেশগুলোর দ্বিধান্বিত পদক্ষেপ এটিকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি বিপন্ন হবে। বৈশি^ক তেলের সরবরাহ বিপর্যস্ত হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। মুসলিম দেশগুলো যদি সম্মিলিতভাবে এ সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বৈশি^ক অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো যেতে পারে। নীরবতা শুধু আঞ্চলিক নয়, বিশ^ অর্থনীতির ওপরও হুমকি সৃষ্টি করেছে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, যখন মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়নি, তখন আক্রমণকারীরা সহজেই তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য লজ্জাজনক এবং নৈতিকভাবে অসমর্থনীয়। রাশিয়া ও চীন কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। এরই মধ্যে রাশিয়া সতর্কবার্তা দিয়েছে এবং ইরানের পাশে অস্ত্র ও কৌশলগত সহায়তা প্রদান করছে। চীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করছে। তারা তেলের বিনিময়ে অস্ত্র দিলেও সরাসরি যুদ্ধে জড়াচ্ছে না, কিন্তু আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্য ও কৌশলগত প্রভাব নিশ্চিত করছে। মুসলিম দেশগুলো যখন নীরব থাকে, তখন আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সংঘাতের প্রতি কৌশলগত প্রভাব ফেলছে। তথ্যযুদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণও চালাচ্ছে আমেরিকা। অনেকে বলছেন ইচ্ছাকৃতভাবে পশ্চিমা এবং ইসরায়েলি সূত্র খামেনি নিহত হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়েছে। কিন্তু তেহরান এই তথ্য সরাসরি নাকচ করেছে। এটি কেবল ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলছে না, মুসলিম বিশ্বকে বিভ্রান্ত করছে। তথ্যযুদ্ধের মাধ্যমে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। সত্য-মিথ্য জানা নেই, তবে পশ্চিমা তথ্যভান্ডারের বিপরীতে প্রকৃত তথ্য যাচাই জরুরি। আসলে আমরা যে তথ্য পাচ্ছি, তা একতরফা। চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া বা ইরানের কোনো গণমাধ্যমের তথ্য আমরা পাচ্ছি না। যে কারণে গুজবের ডালপালা বিস্তৃত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক তেল বাজার ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ঝুঁকি, বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। এসবই মুসলিম দেশগুলো নীরব থাকার ফল। এভাবে আঞ্চলিক সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আঞ্চলিক কূটনৈতিক ব্যর্থতাও রয়েছে। ওমানের মধ্যস্থতা প্রশংসনীয়, তবে যথেষ্ট নয়। মুসলিম দেশগুলো সক্রিয় পদক্ষেপ না নিলে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক হবে। নীরবতা আগ্রাসীদের উৎসাহ দিচ্ছে এবং মুসলিম বিশ্বের প্রভাব কমাচ্ছে। যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান তীব্রতা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিক্রিয়া এবং আঞ্চলিক বিস্ফোরণ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান বৈশি^ক শান্তির জন্য সংকট তৈরি করছে। প্রকাশ্যে কূটনৈতিকভাবে রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তি সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু গোপনে তারা ইরানকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে।
ইরানের ওপর আগুনঝরা হামলা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়। এটি মুসলিম উম্মাহ, বৈশ্বিক নীতি এবং মানবিক নৈতিকতার জন্য একটি সর্তকবার্তা। মুসলিম দেশগুলোকে নীরবতা ত্যাগ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে এবং কূটনৈতিক ও নৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে। হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ অবিলম্বে প্রয়োজন। নীরবতা আর অস্পষ্ট কূটনীতি গ্রহণযোগ্য না, এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। মনে রাখা দরকার, আমরাও অর্থনৈতিকভাবে ভয়ংকর ক্ষতিগ্রস্ত হবো। এই যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে জ্বালানি আমাদানিনির্ভর দেশগুলো অসম্ভব অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে পড়বে। সুতরাং এখনই সময় সমন্বিত উপায়ে পরিকল্পনা করা। না হলে ভয়ংকর মুদ্রাস্ফীতি আমাদের গ্রাস করতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট