মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ ও এলডিসি-পরবর্তী কৌশল প্রণয়ন এসব ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, রপ্তানিতে মন্থরতার কারণে অর্থনীতি চাপে রয়েছে। কিছু ইতিবাচক আভাস থাকলেও সামগ্রিক চিত্র এখনো নাজুক। এ পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে দ্রুত ও কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা।
গতকাল বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনা : নবনির্বাচিত সরকারের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা তুলে ধরেন তারা।
বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এ সময় আরও আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সাবেক সভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে আজাদ, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথোরিটির (এমআরএ) নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বর্তমান কাঠামোতে তিনটি বড় সমস্যার কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যাদের তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা ছিল, তারা বাদ পড়ে যাচ্ছেন। আবার যাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা নয়, তারা তালিকায় চলে আসছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মসূচি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ও খ-িতভাবে পরিচালিত হওয়ায় সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।’ এর জন্য সব কর্মসূচির একক শনাক্তকরণ পদ্ধতি ও ডিজিটাল কার্ড চালুর মাধ্যমে এসব ত্রুটি দূর করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কথা উল্লেখ করে রাশেদ আল মাহমুদ বলেন, ‘মধ্যবিত্তের একটি অংশ নিম্ন-মধ্যবিত্তে এবং নিম্ন-মধ্যবিত্তের অনেকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছেন। এ বাস্তবতায় সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করতে হবে।’
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, ‘সীমিতসংখ্যক বড় করদাতার ওপর নির্ভর করে কর আহরণ টেকসই নয়। তাই কর-সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাতে হবে এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে।’
বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকিকে অসহনীয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এ ব্যয় দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নয়। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ চুক্তি পুনঃআলোচনা, সিস্টেম লস কমানো এবং দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এ কে আজাদ বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ৩৬ শতাংশ গড় ঋণখেলাপি। আর সরকারি ব্যাংকের ঋণখেলাপি হচ্ছে ৫০ শতাংশ। যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি, তাদের জন্য ঋণ থেকে মুক্তির একটি সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমরা এটাকে সমর্থন করি। কিন্তু যারা টাকা নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে কিন্তু অর্থনীতি ভালো জায়গায় আসবে না।’
দেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারকে সবার আগে জ¦ালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন এ কে আজাদ। তিনি বলেন, ‘কারখানায় গ্যাস সংযোগের জন্য মন্ত্রণালয় ও তিতাসে হাজার হাজার আবেদন জমা পড়ে আছে। কিন্তু কোনো নতুন সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। নতুন সংযোগ না হওয়ায় আমরা নতুন শিল্প বিনিয়োগ করতে পারছি না, মূলধনি যন্ত্রপাতি আনতে পারছি না। ফলে কর্মসংস্থানও বাড়ছে না।’
এ কে আজাদ বলেন, ‘গ্যাসের জন্য আমি দ্বিগুণ দাম পরিশোধ করছি। অথচ আমি সিএনজি থেকে গ্যাস নিয়ে কারখানায় বয়লার চালাই। আপনারা (সরকার) বাসাবাড়িতে গ্যাস সিস্টেম (সংযোগ) বন্ধ করে দেন। এখানে তো কোনো কর্মসংস্থান হচ্ছে না। তারা এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করুক। লাইনের গ্যাসটা যদি শিল্পে দেন, তাহলে কারখানা চলতে পারে।’
নতুন সরকারের প্রথম ১৫ দিনে ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, ‘দেড় বছর ক্ষমতায় থাকা সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা দেশের কোনো ব্যবসায়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন না। বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র ১৫ দিন হলেও আমরা এখন সরকারের সঙ্গে সহজে পৌঁছাতে পারছি, যা আগে সম্ভব ছিল না। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সমিতির অভিজ্ঞতা দুটোই পজিটিভ।’
বিজিএমইএ সভাপতি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ‘ডি-রেগুলেশন’ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘নীতিমালা প্রণয়নে স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পলিসি যদি সংশ্লিষ্ট পক্ষদের মতামত নিয়ে তৈরি করা হয় তা টেকসই হবে। একই সঙ্গে ব্যুরোক্রেসি এবং এন্টারপ্রেনারদের মাইন্ডসেটও পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন।’
মূল প্রবন্ধে ফাহমিদা খাতুন জানান, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে। শিল্প ও সেবা খাতে গতি কমে যাওয়া এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এ পতনের বড় কারণ। তবে, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশে উঠেছে। এটি অর্থনৈতিক কর্মকা-ে ধীরে ধীরে গতি ফেরার ইঙ্গিত দিলেও, তা এখনো স্থায়ী পুনরুদ্ধার বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি গত দুই বছরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি করেছে। ২০২৪ অর্থবছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে কিছু তারল্য সূচকে উন্নতি হলেও খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক মানদ-ে ঋণ শ্রেণিকরণ পদ্ধতি চালুর পর খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিছুটা কমলেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না বলে সতর্ক করা হয় প্রবন্ধে।