তাদের নাগরিকরাই দুষছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে হামলার মাধ্যমে এবারকার যুদ্ধের সূচনা করেছে। এ যুদ্ধ দেশ দুটিকে কোন দিকে নেবে, সে বিষয়ে দুই দেশের নাগরিকদের চিন্তায় বেশ ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে।

হারেৎজ ও দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ইউকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েলের বিশ্লেষকরা ভাবছেন, শাসকগোষ্ঠী বদলানোর কথা বলে ওয়াশিংটন যুদ্ধে জড়ালেও ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবনা অনুযায়ী পরিচালিত করা আদৌ সম্ভব নাও হতে পারে। তারা মনে করেন, যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে আমেরিকানদের এখনো কোনো পরিকল্পনা নেই। আর তারা জানে না একটি শাসনব্যবস্থায় প্রকৃত পরিবর্তন কীভাবে আনতে হয়; সূক্ষ্ম জটিল দিকগুলো কীভাবে সামাল দিতে হয়।

এ বিষয়টি এবারই যে প্রথম ঘটার ঝুঁকি আছে, তা নয়। এর আগে ২০০৩ সালে ইরাকে যুদ্ধ শুরু করেও যুক্তরাষ্ট্র তা সুন্দরভাবে শেষ করতে পারেনি।

ইসরায়েলিদের একটি বড় অংশ মনে করে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জেনেশুনেই আমেরিকার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরানের সঙ্গে এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়েছে, যা বেশিরভাগ আমেরিকান চান না। যতক্ষণ পর্যন্ত ট্রাম্প শক্তপোক্তভাবে ক্ষমতায় আছেন, ততক্ষণ হয়তো ইসরায়েল আমেরিকান সুরক্ষা উপভোগ করতে পারবে। ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি ভিন্নরূপ হওয়ার ঝুঁকি আছে। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এমন ভাবনা মনে আসছে অনেক ইসরায়েলির। নেতানিয়াহুর দেশে মধ্যপন্থি নাগরিকদের অনেকে মনে করেন, গাজায় বিপুল প্রাণহানি ও ইরানে হামলার কারণে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের যে ক্ষতি হয়ে গেছে, ট্রাম্প-পরবর্তী আমেরিকায় তা কাটিয়ে ওঠা দুরূহ হতে পারে।

অন্যদিকে, আমেরিকান নাগরিকদের বড় একটি অংশ বোঝার চেষ্টা করছেন, এবারকার যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা গভীর হওয়ার ঝুঁকি আছে।

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সংস্থা পেন ওয়ার্টন বাজেট মডেলের পরিচালক কেন্ট স্মেটার্সের হিসাবে, ইরানের সঙ্গে এবারকার যুুদ্ধের কারণে আমেরিকান অর্থনীতির ২১ হাজার কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হতে পারে। লন্ডন থেকে দি ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তিনি এ তথ্য দেন।

ট্রাম্প ইতিমধ্যে এ যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকির দিকটি স্বীকার করে নিয়েছেন। ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “যুদ্ধের ফলে তেলের দাম ‘কিছু সময়ের জন্য’ বেশি হতে পারে। তবে সংঘাতে শষ হয়ে গেলে, দাম কমবে; আমার বিশ্বাস আগের চেয়েও কম হবে।” কেন্ট স্মেটার্স বলেন, ‘যুদ্ধের খরচের হিসাব নিয়ে একটি সমস্যা হলো, তারা (সরকার) আসলেই পাল্টা তথ্য উপেক্ষা করে।’ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখতে ইরানের কড়া নির্দেশের মুখে ট্রাম্প পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জ্বালানি ট্যাংকারগুলোকে সরকারি অর্থায়নে বীমা এবং সম্ভাব্য নৌ-প্রহরা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, গত মঙ্গলবার বেঞ্চমার্ক-নির্ধারক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটে লেনদেনের শেষদিকে অপরিশোধিত তেলের দাম ৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। আর প্রতি গ্যালন পেট্রোলের জাতীয় গড় দাম ১০ সেন্টেরও বেশি বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের অনেকটাই নির্ভর করবে সংঘাত কতদিন চলবে তার ওপর।

গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবোরেটিভের নীতি ও অ্যাডভোকেসির প্রধান যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অ্যালেক্স জ্যাকেজ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, ‘চলমান অভিযানের কারণে যে ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে, বাজারগুলো তাকে সত্যিই কম গুরুত্ব দিচ্ছে। অথচ এ অভিযান দ্রুত শেষ হবে না। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল পুনরায় শুরু করা যাবে না। সময়মতো সবকিছুতে উত্তেজনা কমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতেও সময় লাগবে।’

কংগ্রেসকে পাঠানো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি চিঠি অনুসারে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের এ যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে, সামরিক অভিযানের পরিধি কতটুকু হবে, তা জানা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়।

পারস্য উপসাগরের আশপাশের অঞ্চল ও ঘাঁটিগুলো থেকে মার্কিন বাহিনী ইরানের দিকে যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে বিস্তৃত সামরিক অভিযানের জন্য আরও ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বাজেট-ব্যয় বেশি হতে পারে। তবে তিনি আগে যে পূর্বাভাস দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে এটা বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা ‘চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ’ স্থায়ী হতে পারে।