ক্যামেরার চোখে জীবনের গল্প

শখ থেকে শুরু। কিন্তু ফটোগ্রাফি এখন মেহেদী হাসান রাব্বির জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাবার সুবাদে শৈশব থেকেই ক্যান্টনমেন্ট পরিবেশে বেড়ে ওঠা রাব্বির ফটোগ্রাফির শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। স্কুলজীবনে, নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে একটি সাধারণ মোবাইল ফোন দিয়ে স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি তুলতেন তিনি। তখন ফটোগ্রাফি সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা না থাকলেও ছবি তোলার প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা তৈরি হয় তার মনে।

রাব্বির জীবনে ফটোগ্রাফির নতুন অধ্যায় শুরু হয় হবিগঞ্জ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়ার সময়। সেখানে বন্ধু তারিফ রাজির অনুপ্রেরণায় তিনি নতুন করে ফটোগ্রাফি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। বন্ধুর উৎসাহেই ইন্টারনেট ঘেঁটে ঘেঁটে ফটোগ্রাফি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিতে থাকেন। করোনা মহামারীর লকডাউনের সময় ময়মনসিংহে অবস্থানকালে প্রথম ক্যামেরা কেনার সুযোগ হয় তার। এই ক্যামেরা কেনার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল তার পরিবারের, বিশেষ করে মা ও বাবার। পারিবারিক বিশ্বাস ও সমর্থনই তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

তবে পথটা সহজ ছিল না। ছবি তোলার শুরুতে আত্মীয়স্বজন ও আশপাশের মানুষের কাছ থেকে নানা কটূক্তি শুনতে হয়েছে তাকে। ‘ছবি তুলে কি ভাত জুটবে?’, ‘পড়াশোনা বাদ দিয়ে নষ্ট হয়ে যাবে’ এমন কথাও শুনতে হয়েছে বহুবার। টানা দুই-তিন বছর এই মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়েছে। তবে মা ও বোনের নিঃশর্ত সমর্থন তাকে ভেঙে পড়তে দেয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এসব কথা কানে না নিয়ে নিজের কাজেই মনোযোগী হয়েছেন।

রাব্বির ফটোগ্রাফির মূল বিষয় মানুষের জীবন। মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না এসবই তিনি ক্যামেরায় ধরে রাখতে ভালোবাসেন। স্ট্রিট ফটোগ্রাফি, ডেইলি লাইফ ও ন্যাচার ফটোগ্রাফি তার পছন্দের ঘরানা। ভবিষ্যতে ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি নিয়ে গভীরভাবে কাজ করার স্বপ্নও রয়েছে তার।

ছবি তুলতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেছেন রাব্বি। ঢাকা, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব, শেরপুরের ঝিনাইগাতী, জামালপুরের বিভিন্ন এলাকা এবং কক্সবাজারসহ নানা স্থানে তার ক্যামেরা ঘুরে বেড়িয়েছে। ছবি তুলতে গিয়ে বিপদের মুখেও পড়তে হয়েছে। একবার একটি বড় রেলস্টেশনে ছবি তুলতে গিয়ে মৃত্যুর হুমকিও পান তিনি। তবুও এসব ঝুঁকিকে পাশ কাটিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন সাহসের সঙ্গে।

তার তোলা উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে ‘কসাই’ নামের ছবিটি বিশেষভাবে আলোচিত। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র পাড়ের কৃষক বাজারে এক শীতের সকালে তোলা এই ছবিটির জন্য তাকে চার দিন ভোরবেলা সেখানে উপস্থিত থাকতে হয়েছিল। সীমিত লেন্স ও সরঞ্জাম নিয়েও দৃঢ় মনোবল দিয়ে কাক্সিক্ষত ছবিটি তুলে আনেন তিনি। আরেকটি আলোচিত ছবি ‘তুমিও কি একা’, যা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে তোলা এক মানবিক মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি।

রাব্বির ছবি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে স্বীকৃতি পেয়েছে। পাকিস্তানভিত্তিক ওয়েবসাইট রহংবধৎপয.ঢ়শ-এ তার প্রোফাইল ফিচার হয়েছে এবং রাশিয়ার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ৩৫ অধিৎফং-এ তার ছবি টপ লিস্টে জায়গা করে নিয়েছে। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার অর্জন করেছেন। ফটোগ্রাফির পাশাপাশি সমাজসেবাতেও সক্রিয় রাব্বি। বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রমে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং এতিমখানাভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত রয়েছেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে রাব্বির ভাষায়, তিনি খুব বেশি দূরের পরিকল্পনায় বিশ্বাসী নন। তবে একটাই লক্ষ্য শেখা থামানো যাবে না। ক্যামেরার মাধ্যমে জীবনের গল্প বলা এবং নিজেকে একজন ভালো আলোকচিত্রী হিসেবে গড়ে তোলাই তার স্বপ্ন।

শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী উপজেলার ছেলে রাব্বি তিনি বর্তমানে নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (ঈঝঊ) বিভাগে বিএসসি অধ্যয়নরত, দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

লেখক : ফিচার রাইটার