কোরিয়ার পথেও কাঁটা ছড়াতে চায় বাংলাদেশ

অভিষেকেই প্রবল পরাশক্তি চীনকে চমকে দিয়েছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। এশিয়ান কাপের বড় মঞ্চে চীনের চোখে চোখ রেখে লড়াই করে তিন দিন আগে হেরেছিল ২-০ গোলে। এ হারে গ্লানি ছিল না, ছিল লড়াইয়ের গর্ব। এমন পারফরম্যান্স বাংলাদেশের তরুণ ফুটবলারদের দিয়েছে আরও বড় লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা। লড়াইয়ের মঞ্চও প্রস্তুত। সিডনির কমব্যাংক স্টেডিয়ামে আরেকটি অগ্নিপরীক্ষা ঋতুপর্ণা চাকমাদের। প্রতিপক্ষ আরও শক্তিশালী উত্তর কোরিয়া। এবার শুধু চমকে দিলেই হবে না, সামর্থ্যরে সেরাটা দিয়ে তিনবারের এশিয়া সেরাদের পথে বিছিয়ে দিতে হবে কাঁটা। চীনের প্রাচীর টলিয়ে দেওয়া পিটার বাটলারের শিষ্যরা কাঁটার আঘাতে উত্তর কোরিয়দেরও ক্ষতবিক্ষত করবেন, আরেকবার গোটা জাতিকে আবেগে ভাসাবেন এ প্রত্যাশা তো করাই যায়।

উত্তর কোরিয়া নামটা কেমন যেন এক অদৃশ্য চাদরে মোড়ানো। নারী বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের নবম দলটি ২০০১, ২০০৩ ও ২০০৮ সালে শিরোপা জয়ের পর ২০১০ সালেও ফাইনাল খেলে। এরপর নানা কারণেই শেষ তিনটি আসরে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়া তো আছেই, গোটা দুনিয়া থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলা দেশটির নারী ফুটবলের হাড়ির খবর পাওয়া বড্ড কঠিন। সেই কঠিন কাজটি করতে হয়েছে বাংলাদেশ দলের কোচ পিটার বাটলারকে। এর মধ্যেই যতটুকু পেরেছেন, প্রতিপক্ষ সম্পর্কে ধারণা নিয়ে সাজিয়েছেন আজকের ম্যাচের কৌশল। আরেকটি সাহসী পারফরম্যান্স নিশ্চিতে সেই কৌশলকে কার্যকর করে তোলাই আফঈদা খন্দকারদের বড় চ্যালেঞ্জ। বাস্তববাদী সত্তাকে আবারও সামনে টেনে এনে বাটলার বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া টেকনিক্যালি দক্ষ এবং ভীষণ প্রতিভাবান একটি দল। ফিফা র‌্যাংকিং বলে দেয় তারা এই টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট। তবে আমাদের নিজেদের সেরা ছন্দে থাকতে হবে। আমি কোনো ঘোরের মধ্যে নেই; আমি বাস্তববাদী মানুষ এবং জানি যে অনেক দিক থেকেই এই ম্যাচ জেতাটা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে মূল বিষয় হলো নিজের সেরাটা দেওয়া এবং নিজের নিজস্বতা ধরে রাখা। আমরা যদি সেটা করতে পারি, তবে বিশ্বাস করি, আবারও আমরা অনেকের হৃদয় জিতে নিতে পারব। চীনের সমর্থকরাও যেভাবে আমাদের সম্মান জানিয়েছে ও খেলার প্রশংসা করেছে, সেটি এক কথায় অসাধারণ।’

আক্রমণই সেরা রক্ষণ কৌশল এই মন্ত্র শিষ্যদের মধ্যে গেঁথে দিয়েছেন শুরু থেকেই। প্রতিপক্ষ যত বড়ই হোক, নিজস্বতা ধরে রেখে বাটলার এ ম্যাচেও চাইছেন আনন্দদায়ী ফুটবল উপহার দিতে, ‘আবারও বলছি আমরা শুধু রক্ষণভাগ সামলে বসে থাকব না, আমরা লড়াই করব। আন্তরিকভাবে আশা করি গত ম্যাচের মতো চরিত্র কালকেও (মেয়েরা) দেখাবে। আগের দিন খেলোয়াড়দের রিকভারি ডে এবং আইসক্রিম ডে ছিল (হাসি)। আমি শুধু আশা করি তারা একই রকম বিনয় নিয়ে মাঠে নামবে এবং আমার পরিকল্পনা অনুসরণ করবে। আমরা যদি সেটা করি, তবে নিজেদের আরেকবার ভালো প্রমাণ করতে পারব।’

বাটলার বিশ্বাস করেন, চীনের বিপক্ষে পারফরম্যান্স যথেষ্ট নয়, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গেও যদি লড়াকু ফুটবল খেলতে পারে দল তবেও প্রমাণিত হবে উন্নতি করেই এশিয়ার সেরা পর্যায়ে উঠে এসেছে বাংলাদেশ, ‘আমি চাই দল প্রমাণ করুক যে তারা একটি উদীয়মান জাতি এবং এখানে থাকার যোগ্য। এখানে কোনো ভাগ্যের জোরে বা ভাগ্যের ফেরে আসিনি। আগের রাতে আমরা হেরেছি, তবে ব্যবধানটা আরও বড় হতে পারত, আবার কমও হতে পারত। ফুটবল পুরোটাই মুহূর্তের খেলা। আমার মনে হয়েছে আমাদেরও কিছু ভালো মুহূর্ত ছিল এবং আগামীকাল উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষেও তেমনটা ঘটবে।’

তথ্যের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটা পরিকল্পনা করেই উত্তর কোরিয়ার কাজকে কঠিন বলেছেন বাটলার, ‘তাদের কীভাবে থামানো যায়... ভালো প্রশ্ন। শুনুন, আমাদের একটি গেম প্ল্যান আছে এবং আমার মনে হয় আমাদের পরিকল্পনাটি বেশ কার্যকর হবে। দিনের শেষে আমরা শুধু বসে থেকে বিপক্ষ দলের আক্রমণ দেখব না। যদি আমরা গোল খাইও। আমি চাই আমাদের দল সক্রিয় থাকুক শুধু রক্ষণাত্মক না হয়ে। যখন বল আমাদের দখলে থাকবে, তখন আমরা আক্রমণাত্মক এবং সৃজনশীল থাকব। আর যখন বল আমাদের কাছে থাকবে না, তখন আমরা মাঠের জায়গা কমিয়ে রক্ষণভাগকে সুসংহত রাখব। এ রকম দলের বিপক্ষে আমাদের খুব সুশৃঙ্খল থাকতে হবে।’

বাংলাদেশ অধিনায়ক প্রায় পুরোটা সংবাদ সম্মেলন জুড়েই কোচের কথা শুনলেন। কখনো মাথা নাড়ালেন, কখনো বা কোচের রসিকতায় হাসলেন। কোচের শেখানো বুলিই আওড়ালেন পাওয়া কথা বলার সুযোগে, ‘উত্তর কোরিয়া অনেক শক্তিশালী। আমরা গত ম্যাচে যে ভুলগুলো করেছি, পরবর্তী ম্যাচে যেন সেই ভুলগুলো না করি, কোচ আমাদের ওভাবেই খেলতে বলেছেন।’

কোচের পরিকল্পনাটা আফঈদার কাছে জানতে চাইলেও হাসতে হাসতে পাশে থাকা অধিনায়ককে বাটলার বলেন, ওদেরকে পরিকল্পনা বলো না। আফঈদাও দিলেন বুঝে শুনে উত্তর, ‘আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব ভালো খেলার। কোচের পরিকল্পনাই আমাদের পরিকল্পনা। শুধু বলতে পারি, আমরা আমাদের সেরাটা দেব এবং মাঠে দেখা যাবে ফল কী আসে।’