ব্রুনাই থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টন তেল কেনার উদ্যোগ

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের সংকট কাটাতে বিকল্প উৎস হিসেবে ব্রুনাই থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগের চালানের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজের তেল খালাস হচ্ছে। আগামীকাল সোমবার আরও দুটি জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সবমিলে জ্বালানি তেল নিয়ে আপাতত কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা।

তারা বলছেন, চলতি মাস তো বটেই, আগামী মাস পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া চীনা জাহাজ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকায় হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার প্রভাবে দেশে জ্বালানি আমদানিতে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কাও কম। বিভিন্ন জ্বালানি তেলের মধ্যে পেট্রোলের প্রায় পুরোটা এবং অকটেনের সিংহভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া এপ্রিল পর্যন্ত ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানি চূড়ান্ত হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন বা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল শনিবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য সরকার সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বিকল্প উৎস হিসেবে ব্রুনাই থেকে জ্বালানি তেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শিগগির তা দেশে এসে পৌঁছাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ব্রুনাই থেকে যে জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে তা মূলত ডিজেল। বোরো মৌসুমে কৃষকের সেচে যাতে সংকট না হয়, সেজন্যই সরকারের এমন উদ্যোগ।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আজ (গতকাল) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সার্বিক বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। বোরো মৌসুমে কৃষকে নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সেই মোতাবেক আমরা কাজ করছি। আশা করি কোন সমস্যা হবে না।’

‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে এমন আশঙ্কায় অনেকেই চাহিদার অতিরিক্তি তেল কিনছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তেল বিক্রির পরিমাণ ২-৩ গুণ বেড়ে গেছে। এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কেটে যাবে যখন দেখবে তেল নিয়ে কোনো সংকট নেই। আমরা সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ফলে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই,’ যোগ করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে দেশে তেলের সম্ভাব্য সংকট ও দাম বাড়ার আশঙ্কায় গত কয়েক দিন ধরে তেল বিক্রি বেড়েছে। পেট্রোলপাম্পগুলোয় ছিল যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তবে গতকাল পরিস্থিতি বেশি জটিল আকার ধারণ করে। দেশের অনেক স্থানেই সকালের পর তেল বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। রাজধানীর অনেক পাম্প ঘিরে ছিল এক-দেড় কিলোমিটারের লম্বা লাইন। দুই-তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল মেলে। সাধারণত সরকারি ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার ডিপো থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকে। ফলে পাম্পগুলোয় এমনিতেই তেলের মজুদ কম থাকে। এর সঙ্গে গুজব ও আতঙ্কে চালকদের অতিরিক্ত তেল কেনা যুক্ত হয়ে গতকাল ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে। সংকট সৃষ্টির পেছনে পেট্রোলপাম্প মালিকরা বিপিসির অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে শুক্র বা শনিবার সীমিত আকারে ডিপো খোলা রাখলে ভোগান্তি কম হতো।

গতকাল বেলা ১১টায় রাজধানীর সাকুরা পেট্রোলপাম্পে মোটরসাইকেলের তেলের জন্য বের হন বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাম্পের সামনে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন। সাকুরা পাম্পের লাইন গিয়ে ঠেকেছে পিজি হাসপাতালে। দীর্ঘ লাইনে ক্ষোভ প্রকাশ করছে চালকরা। কিছু সময় তেল দেওয়ার পর কিছুক্ষণ বন্ধ রাখে পাম্প কর্তৃপক্ষ। আবার চাহিদা থাকলেও একজনকে ৫০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না।

সাকুরার ওই পাম্প থেকে তেল নিতে না পেরে পুরান ঢাকার ভাসমান তেল বিক্রেতার কাছে যান সাইফুল। সেখানে গিয়ে বিস্মিত হন তিনি। খোলা বাজারে প্রতি লিটার তেলের মূল্য বিক্রি হয় ২০০ টাকা। স্থান ভেদে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। তেলের বাড়তি দামের বিষয়ে জানতে চাইলে বিক্রেতা জানান, বাড়তি দাম দিয়ে পাম্প থেকে তেল নিয়ে আসা হয়েছে। তাই ১৩০ টাকার তেল ২০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। কারও প্রয়োজন হলে নেবে না হলে নেবে না। তাও লাইন ধরে সবাই নিচ্ছে।

বাড়তি দামে তেল কিনতে এসে পুরান ঢাকার মোটর মেকানিক সজীব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাই, আমরা বাঙালি জাতি। কোনো কিছু শুনলেই হয়েছে, সেখানেই ব্যবসা খুঁজি। দেশে তেলের সংকট নেই। তারপরও শুনেছে যুদ্ধের জন্য তেল সংকটে পড়তে পারে তাই সিন্ডেকেটের লোকজন তেল মজুদ করে সংকট বাড়াচ্ছে। আমরাও এর ভুক্তভোগী, লাইন ধরে তেল কিনতে শুরু করেছি।’

বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনায় এবং বেশি মুনাফার লোভে কেউ কেউ তেল মজুদ করায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। নাটোরের সিংড়ায় বাঁশঝাড়ে মাটির নিচে ১০ হাজার লিটার ডিজেল মজুদ করায় এক ব্যবসায়ীকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

বাংলাদেশ পেট্রোলপাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নিয়েছেন। ফলে বেশ কয়েকটি পাম্পে তেল ফুরিয়ে গেছে। তিনি বলেন, শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় সাধারণত তেলবাহী গাড়ি চলাচল করে না এবং পাম্পে সরবরাহও বন্ধ থাকে। তবে সেচ মৌসুমে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত এ নিয়ম শিথিল করা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা করা হয়নি। এতে পাম্প মালিকরা সমস্যায় পড়েছেন।

নাজমুল হক বলেন, গ্রাহকরা মনে করছেন আমরা ইচ্ছা করে তেল দিচ্ছি না। অথচ দুপুর আড়াইটার মধ্যেই পাম্পের তেল শেষ হয়ে যায়। অনেকে হইচই করার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ এসে তা যাচাইও করেছে। আজ (রবিবার) ডিপো থেকে সরবরাহ শুরু হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

তেল বিক্রিতে রেশনিং আজ থেকে : কৃত্রিম সংকট এড়াতে এরই মধ্যে যানবাহনে জ্বালানি তেল কেনার সীমা বেঁধে দিয়েছে বিপিসি। আজ থেকে রেশনিংয়ের মাধ্যমে তেল বিক্রি শুরু হবে। সেক্ষেত্রে ডিপো থেকে আগের বছরের হিসাবের চেয়ে ২৫ শতাংশ তেল কম সরবরাহ করা হবে। অর্থাৎ কোনো ফিলিং স্টেশনের মালিক যদি গত বছর এই সময়ে ১০০০ লিটার তেল কেনেন তাহলে তিনি এখন পাবেন ৭৫০ লিটার। মূলত অতিরিক্ত তেল নেওয়া এবং অবৈধ মজুদ ঠেকাতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আজ থেকে তেলের সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। কারণ বেশিরভাগ মানুষ গত তিন দিনে চাহিদার অতিরিক্ত তেল নিয়েছেন। ফলে আগামী কয়েক দিন হয়তো তাদের আর তেল নেওয়া লাগবে না।

তেলের মজুদ পর্যাপ্ত : গতকাল কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জ্বালানির সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এরপর তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে জানিয়ে টুকু বলেছেন, অনেকে আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি তেল সংগ্রহ করছেন। যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা রয়েছে বিধায় রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু মানুষ এই রেশনিংটাকে ভয় পেয়ে মজুদ করা শুরু করেছে। আসলে আমাদের তেলের কোনো অভাব নেই। তিনি বলেন, আগামীকাল আরও দুইটা জাহাজ আসছে, সুতরাং তেলের কোনো সমস্যা নেই। ।

কিছু কিছু পাম্পে তেল না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা তো নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল দিচ্ছি। এখন কোনো পাম্প যদি জলদি বিক্রি করে ফেলে তারপরে তো আর পাবে না, তার পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

আগামী মাস পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত : জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে আপাতত কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন বিপিসির কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, চলতি মাসে যে ১৪টি কার্গো আসার কথা তার বেশিরভাগই চলে এসেছে। কয়েকটা পথে রয়েছে। আগামী মাসে ১৫টি কার্গোর মধ্যে ১৩টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়েছে। দুটি কার্গো পরের মাস অর্থাং মে মাসে পাঠাবে বলে সরবরাহকারীরা জানিয়েছেন। এরপরও সংকট এড়াতে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে তেল আনার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে বলে জানান কর্মকর্তারা। হরমুজ প্রণালির সংকটের বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, চীনা জাহাজ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকায় সেখানেও কোনো সমস্যা হবে না বলে আশা করছি।

জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আগামী মাস পর্যন্ত ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। যা ইতিমধ্যে দেশে আসতে শুরু করেছে। এর বাইরে আরও ১ লাখ টন ডিজেল আমদানি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ৫০ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো ফার্নেস অয়েলের মজুদ রয়েছে।

পেট্রোল ও অকটেন দেশেই হয় : বাংলাদেশের চাহিদার প্রায় পুরো পেট্রোল আর অকটেনের সিংহভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। এ জন্য এই দুই জ্বালানি তেল নিয়ে গ্রাহকদের আতঙ্কিত হতে নিষেধ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের পেট্রোল আসে মূলত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত উপজাত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে। কনডেনসেট থেকে প্রাপ্ত পেট্রোলের পরিমাণ দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি। তাই বিপিসি কয়েকবার পেট্রোল রপ্তানির চেষ্টা করলেও মানসম্মত না হওয়ায় সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এই পেট্রোলের সঙ্গে আমদানি করা অকটেন বুস্টার মিশিয়ে অকটেন তৈরি করা হয়।

দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) ও কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কনডেনসেট থেকে পেট্রোল, অকটেনসহ প্রায় ৪০টি পেট্রোলিয়াম পণ্য তারপিন, রঙের কাঁচামাল ইত্যাদি তৈরি করে। এদের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন। আর বাংলাদেশে পেট্রোল ও অকটেন বার্ষিক চাহিদা ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন।