ইউক্রেনে হামলার কারণে চার বছর আগে রাশিয়াকে দ্রুত নিষিদ্ধ করেছিল বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন। কিন্তু ইরানে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়া এবার অনেক বেশি সতর্ক ও নীরব। এতে দ্বৈত মানদণ্ড বা দ্বিচারিতার অভিযোগ উঠেছে।
দুটি যুদ্ধই শুরু হয়েছে একটি করে শীতকালীন অলিম্পিক শেষ হওয়ার পরপরই—এবং পরবর্তী প্যারালিম্পিক শুরু হওয়ার আগে ও একটি গ্রীষ্মকালীন ফুটবল বিশ্বকাপের প্রাক্কালে। ২০২২ সালের বেইজিং শীতকালীন অলিম্পিকের এর সমাপনী অনুষ্ঠানের মাত্র চার দিন পর রাশিয়ার ট্যাংক ইউক্রেনে প্রবেশ করে। অন্যদিকে মিলান-করতিনা ২০২৬ শীতকালীন অলিম্পিক শেষ হওয়ার ছয় দিনের মাথায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলা শুরু হয়।
২০২২ সালে ফুটবলের বিশ্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) সমর্থনে মাত্র চার দিনের মধ্যে সব রুশ ও বেলারুশিয়ান দলকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে বহিষ্কার করেছিল। তখন আইওসি বলেছিল, রাশিয়া সরকার এবং তাদের সমর্থনকারী বেলারুশ সরকার অলিম্পিক যুদ্ধবিরতির নীতি লঙ্ঘন করেছে।
কিন্তু এবার আইওসি শুধু ইতালিতে অনুষ্ঠেয় প্যারালিম্পিকে অংশ নিতে যাওয়া ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সংঘাতে প্রভাবিত হতে পারেন—এমন ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে। ফিফার সেক্রেটারি জেনারেল মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রম বলেছেন, তাদের সংস্থা পরিস্থিতি “পর্যবেক্ষণ করছে”।
ফ্রান্সের ইএমলিয়ন বিজনেস স্কুলের ক্রীড়া ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ সাইমন চ্যাডউইক বলেন, “অনেকে লক্ষ্য করেছেন, ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর রাশিয়াকে ফিফার প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো আলোচনা এখনো দেখা যায়নি।”
তবে দুই যুদ্ধের মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে।
রাশিয়া স্থলপথে আক্রমণ চালিয়ে ভূখণ্ড দখলকে লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার ক্ষেত্রে এমন কোনো লক্ষ্য প্রকাশ্যে বলা হয়নি।
স্পষ্ট এড়িয়ে যাওয়া
এই গ্রীষ্মে অনুষ্ঠেয় ৪৮ দলের ২০২৬ বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব, কারণ দেশটি অন্যতম আয়োজক। অন্যদিকে ২০২২ সালে ইউরোপীয় প্লে–অফে পোল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে রাশিয়াকে বহিষ্কার করা ফিফার জন্য একটি সমস্যার সমাধান করেছিল।
২০১৮ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক রাশিয়া ইউরোপীয় বাছাইপর্ব শুরু করলেও পরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ডোপিং তদন্তের কারণে কাতার বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্ব থেকে নিষিদ্ধ হয়। রাশিয়াকে সরিয়ে দেওয়া ফিফাকে সম্ভাব্য বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচায়। এবার অবশ্য ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো—যিনি সাধারণত সামাজিক মাধ্যমে বেশ সক্রিয়—এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
ফ্রান্সের রেনে টু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা ও ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ পিম ভারশুরেন এএফপিকে বলেন, “এটি স্পষ্টভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল।” তার মতে, ইনফান্তিনো এবং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির প্রধান কির্স্টি কোভেন্ট্রি রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখে বাস্তববাদী অবস্থান নিচ্ছেন। তিনি বলেন, “২০২২ সালে রাজনৈতিক চাপ এতটাই তীব্র ছিল যে আইওসি বাধ্য হয়েছিল রাশিয়াকে বাদ দিতে। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রকে আলাদা করে লক্ষ্য করা বা বিরোধিতায় যাওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই।”
বিশ্বকাপ আয়োজনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ২০২৮ সালের অলিম্পিকও আয়োজন করবে লস অ্যাঞ্জেলেসে। ভারশুরেনের ভাষায়, “ক্রীড়া পরিচালনায় এক ধরনের ক্ষমতার একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই মূল নিয়ন্ত্রণ, আর তাদের উপসাগরীয় মিত্রদের অর্থায়ন এতে বড় ভূমিকা রাখছে।”
আইওসি ওয়াশিংটন থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করলেও ইনফান্তিনো যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। এমনকি তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বিশেষ ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ ঘোষণাও করেছেন।
ফুটবল প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র এএফপিকে বলেছে, “এটি প্রহসন। তবে বাস্তবিক দিক থেকে বিষয়টি যুক্তিযুক্ত—কারণ তিনি চান তার বিশ্বকাপ নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হোক।”
ইরানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়ার পরেই রয়েছে ইরান। দীর্ঘদিনের এসব নিষেধাজ্ঞা দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
চ্যাডউইক বলেন, “কোন দেশ এতে আপত্তি জানাবে তা বোঝা কঠিন। কারণ ইরানের ক্রীড়া শিল্প এতটাই ছোট যে বৈশ্বিক পর্যায়ে তা প্রায় অদৃশ্য।'' তার মতে, “একজন প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দিলে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের জন্য নিজেদের ভাবমূর্তি ও মূল্যবোধ তুলে ধরার একটি বড় মঞ্চ তৈরি হবে।”
ইরানের শক্তিশালী মিত্ররাও তেমন সহায়তা দিতে পারছে না। রাশিয়া, যার ক্রীড়াবিদরা আবার প্যারালিম্পিকে নিজেদের পতাকা ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে, এখনো তাদের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে চীনের বিশ্ব ফুটবলে প্রভাব কম এবং ২০২২ সালের পর অলিম্পিক ক্ষেত্রেও দেশটি খুব সক্রিয় নয়।
ভারশুরেনের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের ঐকমত্যের পথে না হাঁটার অবস্থানের কারণে অনেক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মতো ক্রীড়া সংস্থাগুলিও একই ধরনের ফাঁদে পড়েছে।
তার ভাষায়, “বহুপাক্ষিকতার ধারণাটিই ভেঙে পড়ছে। ক্রীড়াঙ্গনও সেই ভাঙনের একটি প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি বাস্তবতা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন—যেমনটি অনেক সময় জাতিসংঘের কোনো সংস্থাকেও মনে হতে পারে।”