শাহজালালে নিরাপত্তার চাদরে বড় ছিদ্র!

সরকার পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রশাসনেও পরিবর্তন হয়। কিন্তু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এ ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। দেশ-বিদেশের যাত্রীরা প্রায়ই সেখানে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অপরাধীদের আনাগোনাও বেড়েছে। রেন্ট-এ কারের লোকদের চেঁচামেচিতে অতিষ্ঠ যাত্রীরা। ইমিগ্রেশনে গিয়ে লম্বা লাইনে অহেতুক সময় ব্যয় করতে হচ্ছে যাত্রীদের। একটু সন্দেহ হলেই জেরা করতে করতে কাহিল করা হচ্ছে তাদের। নিরাপত্তার ফারাক থাকায় প্রবল হুমকিতেও আছে বিমানবন্দরটি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এতগুলো সংস্থা কাজ করার পরও বিমানবন্দরে চোরাকারবারিরা এখন অনেকটা বেপরোয়া। স্ক্যানার মেশিনের ফাঁক দিয়ে অবৈধ মালামাল বের হচ্ছে। এসব তথ্য পেয়ে বেবিচক বিমানবন্দরের পরিস্থিতি আরও উন্নতি করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি দুর্বল স্থানগুলো চিহ্নিত করে একটি প্রতিবেদনও তৈরি করেছে। প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন নতুন পরিকল্পনা করলেই হবে না, প্রয়োজন কঠোর তদারকি। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সরিয়ে সৎ ও কর্মঠ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সিভিল অ্যাভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) মানদণ্ড বজায় রাখতে না পারলে দেশের অ্যাভিয়েশন খাত আন্তর্জাতিকভাবে কালো তালিকায় পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। তাদের মতে, শাহজালাল বিমানবন্দর দেশের সম্মানের প্রতীক। এখানে একজন যাত্রীর প্রথম ও শেষ অভিজ্ঞতা দেশের ভাবমূর্তি নির্ধারণ করে। হয়রানি ও নিরাপত্তার ছিদ্রগুলো দ্রুত বন্ধ করা না গেলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।

বেবিচক-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, শাহজালালের নিরাপত্তা বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। ভিআইপি ও ভিভিআইপি শ্রেণির যাত্রীদের লাগেজ স্ক্রিনিংয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারে অতিরিক্ত পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাগেজ মেটাল ডিটেক্টর ও এক্স-রে মেশিনে স্ক্যানের পরও অবশ্যই ম্যানুয়ালভাবে পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। তা ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ক্ষেত্রে আগাম অনুমতির বাধ্যবাধকতা এবং অনুমতির তথ্য সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে। কোনো নিরাপত্তাভঙ্গের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন ও দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে নির্দেশনায়।

বিশেষ চিঠি বেবিচকের : ইতিমধ্যে বেবিচক শাহজালালসহ দেশের সব কটি বিমানবন্দরে চিঠি দিয়ে বলেছে, দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় সব বিমানবন্দরের সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি, ভেহিকল পেট্রোল, ফুট পেট্রোল বাড়ানোসহ মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। বিমানবন্দরগুলোয় সর্বোচ্চ জনবল রাখা এবং সার্বিক ফায়ার সার্ভিল্যান্স কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, বিমানবন্দরে শুধু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অনুমোদিত যাত্রীদের প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং জনসাধারণের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখতে হবে, প্রবেশ ও প্রস্থানপথে সবারই নিরাপত্তা তল্লাশি করতে হবে, যাত্রী, কেবিন ব্যাগেজ, কার্গো ও যানবাহনের যথাযথ তল্লাশি নিশ্চিত করতে হবে, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে স্পর্শকাতর এলাকা এবং সীমানাপ্রাচীর এলাকায় নিয়মিত ও ঘনঘন নিরাপত্তা টহল পরিচালনা করতে হবে। কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি, বস্তু বা কার্যকলাপ শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে, সিসি ক্যামেরা মনিটরিং সেল ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় রাখতে হবে এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। ইমিগ্রেশন পুলিশকে আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে হবে। একেকজন যাত্রী কাউন্টারে আসার পর দ্রুত কার্যক্রম শেষ করতে হবে। কোনো যাত্রীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করা যাবে না। তবে এত নির্দেশনা দেওয়ার পরও অপরাধ থামছে না।

ইমিগ্রেশন ৩ মিনিটে শেষ হওয়ার কথা : বিমানবন্দর সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শাহজালালে প্রতি ৩ মিনিটে ইমিগ্রেশন শেষ হওয়ার কথা, সেখানে একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা বা অন্য কোনো যাত্রীকে গড়ে ৩০-৪০ মিনিটের বেশি লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। দেশের প্রধান আকাশপথের প্রবেশদ্বার হচ্ছে শাহজালাল বিমানবন্দর। প্রতিদিন হাজার হাজার প্রবাসী, দেশি-বিদেশি যাত্রী ও পর্যটকরা এই পথ ব্যবহার করছেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অসহনীয় পরিস্থিতি। একদিকে যাত্রী হয়রানি, অন্যদিকে খোদ বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েই দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। জরাজীর্ণ সীমানাপ্রাচীর থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশনের দীর্ঘ লাইন সব মিলিয়ে শাহজালাল এখন বিশৃঙ্খলার অভয়ারণ্য বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইমিগ্রেশনে অন্তহীন অপেক্ষা : শাহজালাল বিমানবন্দরে বর্তমানে যাত্রীদের সবচেয়ে বড় কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইমিগ্রেশন বিভাগ। ‘যাচাই-বাছাই’-এর নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যগামী শ্রমিক এবং ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আসা যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, ইমিগ্রেশনের অনেক কাউন্টার বন্ধ থাকে। পর্যাপ্ত জনবল থাকলেও সমন্বয়হীনতার কারণে একটি ডেস্কের সামনে যাত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অনেকক্ষণ। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক যাত্রীকে সন্দেহভাজন হিসেবে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব জিজ্ঞাসাবাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে যাত্রীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা।

সক্রিয় অপরাধী চক্র : নিরাপত্তার কড়াকড়ির মধ্যেই বিমানবন্দরে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন অপরাধী চক্র। সোনা চোরাচালান থেকে শুরু করে যাত্রীদের লাগেজ চুরির ঘটনাও ঘটছে। এমনকি বিমানবন্দরের ক্যানোপি-১ ও ক্যানোপি-২ এলাকায় দালালের দৌরাত্ম্য আবার বেড়েছে। বিদেশফেরত সহজ-সরল যাত্রীদের কম ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে ট্যাক্সিতে তুলে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিমানবন্দরের ভেতরেই একটি সংঘবদ্ধ দল যাত্রীদের ট্রলি থেকে ব্যাগ সরিয়ে ফেলা বা মোবাইল ফোন চুরির মতো ঘটনা ঘটছে। তা ছাড়া ডিজিটাল সিস্টেমের কথা বলা হলেও ম্যানুয়াল চেকিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমেনি, যা প্রক্রিয়াকে আরও ধীরগতির করে তুলছে।

জরাজীর্ণ সীমানা ও প্রযুক্তিগত ঘাটতি : একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা যেখানে নিিদ্র হওয়ার কথা, সেখানে শাহজালালের চিত্র উল্টো। বিমানবন্দরের চারপাশের কাঁটাতারের বেড়াগুলো অনেক জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। রানওয়ের উত্তর ও পশ্চিমদিকের সীমানাপ্রাচীর কিছুটা নাজুক অবস্থায় আছে। অনেক জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া এমনভাবে নষ্ট হয়ে আছে, যে কেউ চাইলেই ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে। তা ছাড়া থাকছে না কোনো টহলব্যবস্থাও। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও সিভিল অ্যাভিয়েশনের নিরাপত্তাকর্মীদের তৎপরতা মাঝেমধ্যে দেখা গেলেও অধিকাংশ সময় তাদের মধ্যে শিথিলতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে, রাতের বেলা পাহারার অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। এতে বড় ধরনের নাশকতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আঁকা হয়েছে নিরাপত্তার ছক : এ বিষয়ে এপিবিএনের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির প্রশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সাধারণ আনসার সদস্য বা পুলিশ দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে, যাদের অ্যাভিয়েশন নিরাপত্তা সম্পর্কে বিশেষায়িত জ্ঞান নেই। সাম্প্রতিক একটি গোয়েন্দা সংস্থা নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিবেদন করার পর নড়েচড়ে বসেছে কর্তৃপক্ষ। এতে নিরাপত্তা বাড়ানোর ছক তৈরি করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পুরো বিমানবন্দর এলাকাকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আরও নাইট-ভিশন সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জরাজীর্ণ কাঁটাতারের বেড়া বদলে আরসিসি ওয়াল ও শক্তিশালী সেন্সরভিত্তিক বেড়া স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। বিমানবন্দরের ভেতর যেকোনো অপরাধ দমনে ২৪ ঘণ্টা টহল দেবে বিশেষ প্রশিক্ষিত টিম। ইমিগ্রেশন ডেস্কে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনতে ‘ই-গেটের’ কার্যক্রম দ্রুত চালু করা হবে।

লোডারদের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ : পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দুর্বল আখ্যায়িত করে সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে লোডাররা বিমান থেকে মালামাল নামানোর সময় পাচারের ঘটনা ঘটাচ্ছে। তা ছাড়া লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড শাখায়ও অপরাধচক্র আছে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে না। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী বোঝা গেছে, বিমানবন্দরে দুর্বল নিরাপত্তা আছে। নিরাপত্তার কারণে নিউ ইয়র্ক ফ্লাইটও চালু করা যাচ্ছে না। সরকার ফ্লাইটটি চালু করতে নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে।

সব বিমানবন্দরেই নিরাপত্তার ঘাটতি : বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের সব কটি বিমানবন্দরেই নিরাপত্তার ঘাটতি আছে। শাহজালালের পাশাপাশি শাহ আমানত, ওসমানী, যশোর, কক্সবাজার, সৈয়দপুর ও বরিশাল বিমানবন্দরে নিরাপত্তার ঘাটতি বেশি। ওইসব বিমানবন্দরের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়াগুলোর অবস্থা ভালো না। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রায়ই যাত্রীদের ঠিকভাবে তল্লাশি করা যায় না। পাশাপাশি ভিআইপিদের তল্লাশি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ নিয়ে আমরা আছি কিছুটা বেকায়দায়। মাঝেমধ্যে অ্যাপ্রোন, টারমাক এরিয়া, ট্যাক্সিওয়ে এলাকার পাশাপাশি রানওয়েতে আসা-যাওয়া করছে কেউ কেউ।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিছুদিন আগে বিমানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠক থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সার্বক্ষণিক মনিটরিং বাড়াতে হবে। রানওয়ের চারপাশে আরও সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। বিমানবন্দরের পাশে যেসব ভবনের ছাদ আছে, সেখানে উঁচু দেয়াল তৈরি করতে হবে। কাঁটাতারের বেড়াগুলো ভালো করে স্থাপন করতে হবে। রানওয়ের টিএইচআর ও সেন্ট্রাল লাইন মার্কিং ঠিক আছে কি না পরীক্ষা করতে হবে।’

৪৭টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে। প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করছে শাহজালাল দিয়ে।