মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে দেশে জ্বালানি তেল বিশেষ করে পেট্রোল-অকটেন নিয়ে যে হইচই ছিল তা কিছুটা কমতে শুরু করেছে। ফিলিং স্টেশনগুলোয় আগের চেয়ে ভিড় তুলনামূলক কমেছে। পাশাপাশি যানবাহনে তেল নেওয়ার সীমাও বাড়িয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
এদিকে বিরোধপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশি জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলেও কোনো বাধা থাকবে না বলে ইরান আশ্বাস দিয়েছে।
সার্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সাংবাদিকদের জানান, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই এবং আপাতত দাম বাড়ানোরও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যেও আগামী মে মাস পর্যন্ত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত স্বাভাবিকভাবে চালু রাখার সক্ষমতা রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। একই সঙ্গে সরবরাহঝুঁকি মোকাবিলায় ভারতসহ বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, মার্চ মাসে দেশে জ্বালানি সরবরাহে কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি। জনগণের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তা দ্রুত কেটে যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। সরকার ইতিমধ্যে এপ্রিল ও মে মাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি হলে তা মোকাবিলায় বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আমদানির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানির সম্ভাবনা নিয়েও কাজ চলছে।
ভারত থেকেও সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ভারত-বাংলাদেশ পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টন জ্বালানি সরবরাহ আসে এবং সুযোগ থাকলে তা আরও বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনার জন্য বলা হয়েছে। পাম্পে দীর্ঘ লাইনের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় পেট্রোল পাম্পে ভিড় দেখা যাচ্ছে। এসব যানবাহনে মূলত পেট্রোল ও অকটেন ব্যবহার হয় এবং এই দুই জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। জ্বালানি পাওয়া যাবে না বা দাম বাড়তে পারেএমন আশঙ্কা থেকেই অনেকেই আগেভাগে জ্বালানি নিচ্ছেন।
তিনি জানান, পেট্রোল প্রায় পুরোপুরি দেশেই পরিশোধিত হয় এবং অকটেনের বড় অংশও দেশে উৎপাদিত হয়, যদিও কিছু অংশ আমদানি করতে হয়। তবে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি।
সরবরাহব্যবস্থায় কোনো ধরনের অসাধু তৎপরতা ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাইড শেয়ার চালকদের সুবিধার্থে প্রতিদিন ৫ লিটার করে জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশেষ ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও আমাদের বড় কোনো সমস্যা হবে না। মে মাস পর্যন্ত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত স্বাভাবিকভাবে সচল রাখার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।’
এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশি জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা দেওয়া হবে না বলে ইরান আশ্বাস দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশি জাহাজগুলো প্রণালিতে প্রবেশের আগে ইরানকে অবহিত করলে তাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ লাইনের কারণে ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। অনেক ফিলিং স্টেশনে তেল না থাকায় সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখতে হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
এ পরিস্থিতিতে সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও কঠোর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
একই সঙ্গে পেট্রোল ও অকটেনের ডিপো পর্যায়ের সরবরাহ দ্রুত উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটারস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির মতে, বর্তমানে প্রায় ২৫ শতাংশ রেশনিং থাকায় অনেক পাম্পে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পৌঁছাচ্ছে না। ডিপো পর্যায়ে সরবরাহ উন্মুক্ত করা হলে পাম্পগুলোর ওপর চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগও অনেকটা কমে যাবে।
ভারত থেকে আসছে ৫ হাজার টন ডিজেল : দেশ রূপান্তরের পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি কেন্দ্র থেকে পাইপ লাইনে সরাসরি দিনাজপুরের পার্বতীপুরের রেলওয়ে হেড ডিপোতে ডিজেল আসতে শুরু করেছে।
গত সোমবার বিকেল থেকে পাইপ লাইনে পাম্পিং ভারতের নূমালীগড় রিফাইনারি থেকে ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। ৬০ ঘণ্টার মধ্যে আজ বুধবার ৫ হাজার (৬০ হাজার লিটার) টন ডিজেল পৌঁছাবে পার্বতীপুরের ডিপোর সংরক্ষণাগারে।
জানা গেছে, কৃষিনির্ভর উত্তরের ৮ জেলায় চাষাবাদ সেচে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি ডিজেলনির্ভর জ্বালানি সরবরাহ যানবাহন চলাচল নির্বিঘœ রাখতে পাইপ লাইনের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ নিতে ২০১৭ সালে ২২ অক্টোবর ১৫ বছর মেয়াদি ভারতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চলতি বছর পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আসবে পাইপলাইন বেয়ে।
রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রেলপথ এবং যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি এড়াতে ভারতের আসামের শিলিগুড়ির নূমালীগড় রিফাইনারি কেন্দ্র থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত দীর্ঘ পাইপ লাইন স্থাপন করা হয়।
চুক্তি অনুসারে ২০২৬ সালে মোট এক লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানি করতে পারবে বাংলাদেশ। সেই চুক্তি অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বিপিসি। ডিজেল আমদানিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর একটি অংশ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন নিজস্ব অর্থায়নে এবং বাকি অংক ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
এছাড়াও আগামী ৪ মাসের মধ্যে ওই পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত আরও ৫০ হাজার টন ডিজেল আমদানির জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বিপিসি।
উল্লেখ্য, প্রতিবেশী দেশটি পাইপ লাইনের মাধ্যমে ২০২৩ সালে ৩৫ হাজার ৭১৮ টন, ২০২৪ সালে ২৮ হাজার ২০৪ টন, ২০২৫ সালে এক লাখ ২৪ হাজার ২১৬ টন ডিজেল সরবরাহ করেছে।