মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার আটপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী সভাপতি আবদুল হাই দেশ রূপান্তরকে সম্প্রতি জানান, এলাকায় বসবাস করছেন তিনি। এখনো পর্যন্ত নিরাপদে আছেন, তবে সতর্কভাবে চলাফেরা করতে হচ্ছে। একই উপজেলার পাটাভোট ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি পাপ্পু খানও বলেন, এলাকায় আপাতত বসবাস করছি। তবে ভীষণ সতর্কতার সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ উপজেলায় মামলা নেই, নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের এমন সব নেতাই বসবাস করছেন বাসাবাড়িতে।
এ উপজেলায় আটপাড়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান সোলাইমান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করছেন তিনি এবং চেয়ারম্যানের কার্যক্রমও পরিচালনা করছেন। তার বিরুদ্ধে ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নাশকতার মামলা থাকলেও এখনো এলাকায় বসবাস করছেন আওয়ামী লীগের এই নেতা।
নেত্রকোনা জেলার একজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মারুফ হাসান খান অভ্র জেলা আওয়ামী লীগের যুুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও। রবিউল আওয়াল শাওন নেত্রকোনা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় জেলে যেতে হয়েছে। তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার ১০-১৫ দিনের মধ্যে তিনি কারামুক্ত হন। ১৬ মাসের অধিক সময় কারাভোগ করে এখন নিজের এলাকায় বসবাস করছেন তিনি। শুধু মুন্সীগঞ্জ বা নেত্রকোনা নয়, নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানেই রয়েছে প্রায় একই চিত্র। এলাকায় থাকার সুযোগ ঘটেছে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের। তারা এলাকায় থাকছেন সরকারি দল বিএনপির সঙ্গে সদ্ভাব রেখেই।
মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার আটপাড়া ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট হয় এমন কোনো রাজনীতি করতে চাই না। তিনি জানান, এলাকায় সবাই সবার মতো করে বসবাস করছেন।
ফরিদপুর-৪ আসনের সীমানা জটিলতা নিয়ে আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান ম ম সিদ্দিক মিঞা (৫৭) ১৭৫ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর ফরিদপুর জেলা কারাগারের ফটকে তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান ওই আসনের বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল।
গত ৮ মার্চ রবিবার দুপুরে ফরিদপুর জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান সিদ্দিক মিঞা। তিনি ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক। মুক্তির পর সিদ্দিক মিঞা বলেন, তার মুক্তির জন্য বিএনপির নবনির্বাচিত এমপি শহিদুল ইসলাম বাবুলের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ।
অন্যদিকে এমপি শহিদুল ইসলাম বাবুল বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের আইনি সহায়তার মাধ্যমে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই সিদ্দিক মিঞার মুক্তি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বাকি আসামিদের মুক্তির জন্যও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নেত্রকোনা, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর ছাড়াও সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, পঞ্চগড়, চট্টগ্রাম, খুলনা, বাগেরহাট, দিনাজপুর, মাগুরা, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের বিভিন্ন উপজেলায় আওয়ামী লীগের তৃণমূলপর্যায়ের নেতারা আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে এসে নিজের বাসাবাড়িতে বসবাস করা শুরু করেছেন। এসব জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগের পদধারী নেতারাও জামিনে বের হয়ে আসতে শুরু করেছেন এবং নিজের বাসাবাড়িতে থাকছেন।
ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে আওয়ামী লীগকে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কোন কৌশলে রাজনীতি করবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। কী হতে পারে বিএনপির কৌশল, কী কৌশল নিতে পারে আওয়ামী লীগ দুই দলের তৃণমূলপর্যায়ের কেউ সেটা জানেন না। এর মধ্যেই বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তৃণমূলপর্যায়ে মেলামেশা চলছে। দুটি দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে সদ্ভাব দেখা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়।
অনেক জেলা-উপজেলায় বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা (এমপি) আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নির্ভয়ে এলাকায় থাকা ও চলাচলের সবুজসংকেত দিচ্ছেন এমন তথ্যও পাওয়া গেছে। স্থানীয় রাজনীতিতে ঝামেলায় পড়তে হবে না অনেক জেলা-উপজেলায় এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন এমপিরা। নির্বাচনের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বন্ধ থাকা দলীয় কার্যালয় খুলতে দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনে বিএনপির এমপিদের নির্বাচিত করতে আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ায় এক ধরনের কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে বিএনপি-আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতিতে সদ্ভাবের সংস্কৃতি চালু হয়েছে।
বিএনপির তৃণমূলপর্যায়ের কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকে এ ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা আসেনি। আওয়ামী লীগের তৃণমূলপর্যায়ের নেতারাও দেশ রূপান্তরকে জানান, দলের শীর্ষপর্যায়ের কোনো নির্দেশনা নেই। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে এলাকায় থাকতে বলা হয়েছে।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের তৃণমূলপর্যায়ের নেতারা আরও বলেন, ‘মত-পথ ও আদর্শ ভিন্ন হতেই পারে; কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধিতা পাড়া-প্রতিবেশী এবং মহল্লায় আপাতত অব্যাহত থাকুক, সেটা চাই না। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি শুরু করতে চাই বলে সবাই সবার মতো করে নিজ নিজ এলাকায় বসবাসের চেষ্টা করছি।’