অঘোষিত মৃত্যুদণ্ড ভয়ংকর দারিদ্র্য

বিশ্ব নিজেকে উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও মানবাধিকারের যুগ হিসেবে দাবি করলেও, এর আড়ালে প্রতিদিন ঘটে চলেছে এক নীরব মানবিক বিপর্যয়। ক্ষুধা, অপুষ্টি ও চিকিৎসার অভাবে যেসব মৃত্যু হচ্ছে, সেগুলো কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা হঠাৎ মহামারীর ফল নয়। বরং সেগুলো সরাসরি দারিদ্র্যের ফসল। এই মৃত্যু অধিকাংশ সময় ‘ক্ষুধাজনিত মৃত্যু’ হিসেবে নথিভুক্ত হয় না। এই অদৃশ্য সত্যটাই সভ্যতার সবচেয়ে লজ্জাজনক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দারিদ্র্য অনেক গভীর ও বহুমাত্রিক। এটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা কাড়ে, চিকিৎসাসেবার দরজা বন্ধ করে, শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত করে এবং সামাজিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

একজন দরিদ্র মানুষ শুধু অর্থহীন নয়, সে প্রতিদিন বেঁচে থাকে এক ধরনের অদৃশ্য যুদ্ধের মধ্যে, যেখানে ক্ষুধা তার স্থায়ী সঙ্গী, অসুস্থতা তার নিত্য আতঙ্ক এবং মৃত্যু তার ছায়াস্বরূপ। এই প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্যকে কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা বড় ভুল। দারিদ্র্যের পেছনে প্রায়ই থাকে কাঠামোগত বৈষম্য, অসাম্যপূর্ণ সম্পদ বণ্টন, সীমিত কর্মসংস্থান, অপ্রতুল সামাজিক সুরক্ষা এবং দুর্বল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে যখন বড় একটি জনগোষ্ঠী প্রান্তিক হয়ে পড়ে, তখন দারিদ্র্য ব্যক্তিগত সমস্যা না হয়ে একটি সামষ্টিক সংকটে পরিণত হয়। ফলে একজন দরিদ্র মানুষের মৃত্যু আসলে কেবল তার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি পুরো সামাজিক কাঠামোর ব্যর্থতার প্রতিফলন।

ক্ষুধা ও অপুষ্টি দারিদ্র্যের সবচেয়ে নীরব কিন্তু শক্তিশালী অস্ত্র। ক্ষুধা মানুষকে হঠাৎ হত্যা করে না, এটি ধীরে ধীরে শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে দেয়, চিন্তার শক্তি কমিয়ে দেয় এবং সামান্য অসুখকেও প্রাণঘাতী করে তোলে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অপুষ্টির প্রভাব মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী। অপুষ্ট শিশুরা সহজেই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা জ্বরে মারা যায়। বাইরে থেকে এই মৃত্যুকে রোগজনিত বলা হলেও প্রকৃত সত্য হলো যদি পর্যাপ্ত খাদ্য ও পুষ্টি থাকত, তাহলে সেই রোগ মৃত্যু ডেকে আনত না। এই সত্যটি যখন পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয় না, তখন ক্ষুধাজনিত মৃত্যুর বাস্তব চিত্রও সমাজের অগোচরে থেকে যায়। দীর্ঘদিনের অপুষ্টি শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং ভবিষ্যতে তাদের উৎপাদনশীলতা সীমিত করে দেয়। ফলে দারিদ্র্য একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্থানান্তরিত হতে থাকে। এইভাবে ক্ষুধা শুধু বর্তমানকে নয়, ভবিষ্যৎকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে নীরব চক্র তৈরি করে, যেখানে জন্ম থেকে অনেক মানুষ অসম প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করতে বাধ্য হয়।

গর্ভধারণ ও প্রসব একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া হলেও দরিদ্র নারীদের জন্য এটি প্রায়ই মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। পুষ্টিকর খাবারের অভাব, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না থাকা এবং দক্ষ চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে না পারা  সবকিছু একত্রে মাতৃত্বকে বিপজ্জনক করে তোলে। অনেক নারী শুধুমাত্র অর্থের অভাবে হাসপাতালে যেতে না পেরে,  প্রসবকালে ও  প্রসব-পরবর্তী জটিলতায় মারা যান। সমাজ তখন এটিকে ভাগ্য বা নিয়তি বলে মেনে নেয়, অথচ এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবহেলার ফল। গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে এই ঝুঁকি আরও বেশি। সেখানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা কম, দক্ষ চিকিৎসকের উপস্থিতি সীমিত এবং জরুরি পরিবহনের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ফলে একজন গর্ভবতী নারী যখন হঠাৎ জটিলতায় পড়েন, তখন সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া অসম্ভব হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার চিকিৎসার খরচের ভয়ে দেরি করে সিদ্ধান্ত নেয়, আর সেই দেরিই জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, অসংখ্য মানুষ এমন রোগে মারা যায়, যেগুলো আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সহজেই নিরাময়যোগ্য। যক্ষ্মা, টাইফয়েড, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া কিংবা সাধারণ সংক্রমণ এসব রোগ দরিদ্র মানুষের জন্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, শুধুমাত্র চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পারার কারণে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্যব্যয়ের আর্থিক চাপ। উন্নয়নশীল অনেক দেশে স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশই মানুষকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়। ফলে একটি গুরুতর অসুখ শুধু জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে না, বরং পুরো পরিবারকে আরও গভীর দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। অনেক পরিবার চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করে বা ঋণ নেয়, এবং তবুও প্রিয়জনকে বাঁচাতে পারে না। এই পরিস্থিতি দারিদ্র্য ও অসুস্থতার এক দুষ্টচক্র তৈরি করে, যেখানে একটির কারণে আরেকটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই বাস্তবতা আরও জটিল। দারিদ্র্য হ্রাস, আয় বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য সূচকে অগ্রগতির গল্প যতই বলা হোক না কেন, দেশের ভেতরে গভীর বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। গ্রামাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল ও শহরের বস্তিগুলোতে দারিদ্র্য আজও মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে অপুষ্টি, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও উচ্চ চিকিৎসা ব্যয় একত্রে কাজ করে মানুষকে নীরব মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তোলে তথ্যের অদৃশ্যতা।

ক্ষুধা বা চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর জন্য কোনো আলাদা ও শক্তিশালী তথ্যব্যবস্থা নেই। বহু মৃত্যু ঘটে বাড়িতে, কোনো চিকিৎসা নথি তৈরি হয় না। ফলে রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানে এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উঠে আসে না।  এই পরিস্থিতি কেবল উন্নয়ন বা অর্থনীতির প্রশ্ন নয়, এটি গভীর নৈতিক সংকট। পৃথিবীতে যেখানে খাদ্য অপচয় হয় বিপুল পরিমাণে, সেখানে ক্ষুধায় মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দারিদ্র্যকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া মানে, সমস্যার মূল উৎসকে অস্বীকার করা। এতে করে দায় ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর রাষ্ট্র ও সমাজ নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। এই মানসিকতাই দারিদ্র্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে এবং মৃত্যুকে নীরব করে তোলে।  এই নীরবতা ভাঙা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : গবেষক

zia.rahman14@yahoo.com