প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয়, আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সাক্ষরতার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। তবে সাক্ষরতার প্রশ্নটি কেবল অক্ষর চিনতে পারা, নিজের নাম লিখতে পারা অথবা একটি সাধারণ বাক্য পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চলমান শতাব্দীতে সাক্ষরতা মানে তথ্য বোঝার সক্ষমতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার যোগ্যতাও এর সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় সাক্ষরতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, নারীশিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং প্রাথমিক শিক্ষাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সামগ্রিক শিক্ষার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু সামনে আরও বড় প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি শুধু শিক্ষার সুযোগ বাড়াচ্ছি, নাকি সত্যিকার অর্থে জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারছি?
বর্তমান যুগে সাক্ষরতার ধারণা বিস্তৃৃত হয়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে ডিজিটাল সাক্ষরতা এখন অপরিহার্য। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, অনলাইন ব্যাংকিং, ডিজিটাল সরকারি সেবা এবং সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জ্ঞান না থাকলে, একজন মানুষ সহজেই পিছিয়ে পড়তে পারেন। একইসঙ্গে অনলাইনে ভুল তথ্য শনাক্ত করা, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা রক্ষা এবং দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করাও আধুনিক সাক্ষরতার অংশ। তাই বাংলাদেশকে শুধু প্রচলিত নিরক্ষরতা দূর করলেই চলবে না; ডিজিটাল ও তথ্য-সচেতন জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে গুরুত্ব দিতে হবে। সাক্ষরতা নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষিত নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন। একইভাবে শিক্ষিত বাবা-মা সাধারণত সন্তানের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি সচেতন হন। ফলে একজন মানুষের সাক্ষরতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। সাক্ষরতার প্রথম শর্ত হলো, পড়তে ও লিখতে পারা। কিন্তু আধুনিক বাস্তবতায় এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘কার্যকর সাক্ষরতা’। একজন মানুষ যদি একটি নির্দেশনা পড়েও তার অর্থ বুঝতে না পারেন, ব্যাংকের ফরম পূরণ করতে না পারেন, ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করতে না পারেন কিংবা অনলাইনে পাওয়া সত্য-মিথ্যা তথ্যের পার্থক্য করতে না পারেন তাহলে কেবল অক্ষরজ্ঞান দিয়ে জীবনমানের কাক্সিক্ষত পরিবর্তন সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশে সাক্ষরতা আন্দোলনকে এখন প্রথাগত ধারণার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সাক্ষরতার সংজ্ঞাও বদলে গেছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, অনলাইন ব্যাংকিং, সরকারি ডিজিটাল সেবা, টেলিমেডিসিন, অনলাইন শিক্ষা সবকিছুই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। কিন্তু ডিজিটাল সুবিধা তখনই মানুষের ক্ষমতায়নে পরিণত হবে, যখন মানুষ এসব প্রযুক্তি নিরাপদ ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষার মান। বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এবং নিয়মিত পাঠ গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু শিশুরা আদৌ বয়স অনুযায়ী পড়তে, লিখতে, বুঝতে ও গণনা করতে পারছে কি না সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাক্ষরতা দিবস শুধু বিদ্যালয়ে শিশুর উপস্থিতির হিসাব করতে নয়, শেখার প্রকৃত ফলাফল নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
সাক্ষরতার সঙ্গে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সম্পর্ক গভীর। প্রত্যন্ত অঞ্চল, চরাঞ্চল, হাওর-বাঁওড়, পাহাড়ি এলাকা কিংবা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ঝরে পড়া শিশু, কর্মজীবী কিশোর-কিশোরী এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্যও প্রয়োজন আলাদা ও বাস্তবসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা। একটি দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হয়, যখন উন্নয়নের সুযোগ সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়। ‘প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতা’ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। জীবনের একটি পর্যায়ে বিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষকে ‘শিক্ষার বাইরে’ রাখলে জাতীয় উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কর্মক্ষেত্র, কমিউনিটি, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে বয়স্কদের জন্য নমনীয় শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। বিশেষ করে নারীদের জন্য এমন উদ্যোগ পরিবার ও সমাজ দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সাক্ষরতার ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছে। এখন প্রয়োজন অর্জনকে টেকসই করা এবং ‘কতজন পড়তে পারে’ এই প্রশ্নের পাশাপাশি ‘কতজন পড়ে বুঝতে, প্রয়োগ করতে এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে’ এই প্রশ্নকে সামনে আনা। আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে প্রযুক্তিনির্ভর, জ্ঞানভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক। সেই বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য শুধু উচ্চশিক্ষিত একটি ছোট শ্রেণি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন একটি জনগোষ্ঠী, যারা তথ্য বুঝবে, প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে। অক্ষরজ্ঞান থেকে কার্যকর সাক্ষরতা, কার্যকর সাক্ষরতা থেকে ডিজিটাল ও তথ্যসাক্ষরতা এই ধারাবাহিক অগ্রযাত্রা পারে আরও সক্ষম, সচেতন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। শিক্ষার আলো কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা পৌঁছে যাবে মানুষের চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও জীবনযাপনে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে এই হোক সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক চ্যানেল আই।