শিল্প ও বাণিজ্য নগরী নারায়ণগঞ্জে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা। প্রতিদিন জেলার প্রধান প্রধান সড়ক এবং পাড়া-মহল্লায় ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন অনেকে। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, সবজি বিক্রেতা, শ্রমিকসহ কেউই রেহাই পাচ্ছে না তাদের হাত থেকে। অটোরিকশা চালককে হত্যা করেও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। ভোর থেকে গভীর রাত অবধি সুযোগ বুঝে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী। এ সময় কেউ ছিনতাইকারীদের বাধা দিতে গেলেই ঘটছে প্রাণহানি। রেহাই মিলছে না নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদেরও। গত সোমবার ভোরে টহলের দায়িত্বে নিয়োজিত পোশাকধারী পুলিশ কর্মকর্তার অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হওয়ার পরে জনমনে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।
জানা গেছে, শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী হওয়ায় স্থানীয় ও বিভিন্ন জেলার ৫০ লক্ষাধিক লোকের বসবাস এ জেলাতে। নারায়ণগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। এছাড়া রয়েছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ সড়ক, নারায়ণগঞ্জ-আদমজী সড়ক, নাগিনা জোহা সড়ক, ৩০০ ফিট হাইওয়ে, এশিয়ান হাইওয়েসহ অনেক আঞ্চলিক সড়ক। এসব সড়কে রাত যতই গভীর হতে থাকে, ততই ছিনতাইকারীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন স্থানেও বেড়েছে ছিনতাই। সুযোগ বুঝে ছিনতাইকারীরা লুটে নেয় মানুষের টাকা-পয়সা।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, ছিনতাইকারীরা টার্গেট করে প্রথমে তারা দলগতভাবে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নিরীহ মানুষদের জিম্মি করে টাকা ও সঙ্গে থাকা মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। নারায়ণগঞ্জ শহরে ছিনতাইয়ের ১০ থেকে ১২টি স্পটে সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে চাষাঢ়া, উকিলপাড়ার সামনে বঙ্গবন্ধু সড়ক, নয়ামাটির হোসিয়ারি পল্লীর পাশে অবস্থিত করিম মার্কেট, মাসদাইরের বোয়ালিয়া খাল, জামতলা ও চাষাঢ়া-পঞ্চবটী সড়ক, দেওভোগ পানির ট্যাংকি, জিমখানা রেলওয়ে কলোনি সংলগ্ন জল্লারপাড় পার্ক, পাইকপাড়া এবং শীতলক্ষ্যা নদী তীরের ওয়াকওয়েগুলোতে সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
গত ৯ মার্চ ভোর ৬টায় শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকায় নগর ভবনের সামনে ইউনিফর্ম পরিহিত উপ-পরিদর্শক (এসআই) লুৎফর রহমানের সরকারি পিস্তল-গুলি ছিনিয়ে নেয় তিন ছিনতাইকারী। এ ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ছিনিয়ে নেওয়া সরকারি পিস্তলটি গুলি-ম্যাগজিনসহ উদ্ধার করে এক ছিনতাইকারীকে আটক করেছে পুলিশ।
গত ৮ মার্চ ভোর সাড়ে ৬টার দিকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি কড়ইতলা এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে গণপিটুনিতে এক ছিনতাইকারী নিহতের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় তার অপর দুই সহযোগী পালিয়ে যায়। গত কয়েকদিনের ব্যবধানে শহরের পাইকপাড়া ও ডন চেম্বার এলাকাতেও ছিনতাইয়ের ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের বন্দরের লক্ষণখোলা পাতাকাটা স্ট্যান্ড এলাকায় রনি নামে এক বিকাশ এজেন্ট কর্মীকে ফাঁকা গুলি ছুড়ে কাছে থাকা ২ লাখ ৯২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা। তবে ৩ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। গত ২০ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার নয়াপুর পশ্চিমপাড়া এলাকায় প্রতিবন্ধী চালক সোহেলকে স্কচটেপ পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার পর অটোরিক্সা ছিনতাই করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। গত ৭ জানুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জে র্যাব পরিচয়ে একটি জুয়েলারি দোকানের দুই কর্মচারীকে অপহরণ করে ৮০ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায় র্যাব পরিচয়ে ছিনতাইকারীরা। এ সময় তাদের গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে মারধরের পর বন্দরের লাঙ্গলবন্দ ব্রিজের নিচে সড়কের পাশে ফেলে চলে যায় ছিনতাইকারীরা। এর আগে ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর ভোর ৬টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগে মিন্নত আলী মাজারের সামনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হয় কলেজ শিক্ষার্থী সীমান্ত (২০)। সে রাজধানী ঢাকার আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি) নামের বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, অনতিবিলম্বে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সন্ত্রাসী ছিনতাইকারীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন থানা থেকে যেসব অস্ত্র লুট হয়েছে সেগুলোও দ্রুত উদ্ধার করতে হবে। পাশাপাশি টহল আরও বাড়াতে হবে।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জবাসীকে নিরাপদে রাখার জন্য আমাদের বিভিন্ন স্থানে টহল কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আমরা বিগত দিনে বেশ কিছু চিহ্নিত ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছি। দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় আমাদের এক কর্মকর্তার অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমরা অস্ত্র উদ্ধার ও জড়িত এক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছি। নগরবাসীর নিরাপত্তায় পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণরূপে অভিযানে রয়েছে।’