সরকারি সাড়ে ৪ একর জমি বিক্রি করে দিয়েছে বিওসি

সরকারের অনুমোদন ছাড়াই সরকারের প্রায় সাড়ে চার একর জমি বিক্রি করে দিয়েছে বাংলাদেশ অক্সিজেন কোম্পানি (বিওসি)। শুধু তাই নয়, ২০০৫ সালে বিক্রির সময় সরকারি এ জমির বাজারদর ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা হলেও সেটা বিক্রি করা হয়েছে মাত্র ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। গুরুতর এ অনিয়ম ধরা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে। এ ঘটনায় একটি মামলাও করা হয়েছে।

দুদক থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, পাকিস্তান আমলে শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি এবং অক্সিজেন তৈরির জন্য সরকার খুলনা সদর উপজেলার লবণচরা মৌজায় ৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে। পরে জমিটি পাকিস্তান অক্সিজেন কোম্পানিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। দেশ স্বাধীনের পর সেই জমিটি বাংলাদেশ অক্সিজেন কোম্পানির (বিওসি) কাছে আসে। বিওসি সরকারের অনুমোদন ছাড়াই সেখান থেকে ৪ দশমিক ৩৬ একর জমি বিক্রি করেছে। জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য ৭০ থেকে ৭৫ কোটি টাকা। বিওসির বর্তমান নাম আবার ‘লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেড’।

দুদকের তথ্য বলছে, ১৯৬৩ সালের ২৭ জুলাই গভর্নর অব দ্য প্রভিন্স অব ইস্ট পাকিস্তান এবং পাকিস্তান অক্সিজেন লিমিটেডের মধ্যে খুলনা সদর উপজেলার লবণচরা মৌজায় ৫ একর জমি অধিগ্রহণ বিষয়ে একটি ডিড অব অ্যাগ্রিমেন্ট সম্পাদিত হয়। ওই এলাকার শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি এবং অক্সিজেন তৈরির জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরে একই বছরের ১ আগস্ট পজেশন সার্টিফিকেটের মাধ্যমে জমিটি পাকিস্তান অক্সিজেন লিমিটেডকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী অধিগ্রহণ করা জমি লিজ বা হস্তান্তরের সুযোগ নেই এবং জমিটি যে উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে, ওই উদ্দেশ্য ছাড়া ভিন্ন কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

জমিটি জেলা প্রশাসন থেকে লিজ বা হস্তান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়নি। বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অক্সিজেন লিমিটেড (যার পূর্ব নাম পাকিস্তান অক্সিজেন লিমিটেড)। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, খুলনা জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসের অধীন সদর উপজেলার লবণচরা মৌজার সিএস ও এসএ-১৯৭, ১৯৮, ১৯৯, ২০০, ২০১, ২০২, ২০৩, ২০৪, ৩০৩, ৩০৪, ৩০৬, ৩০৭ ৩০৮ এবং ৩১৬ নং দাগের ৪ দশমিক ৩৬ একর বা ২৬১ কাঠা জমি ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ৪ ডিসেম্বর বিওসির ১৪৬তম বোর্ডসভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০০৫ সালের ৭ জুন জমিটি (জমির দলিল নম্বর-১৬৬৭) এনেম এক্সপ্রেস লিমিটেডের কাছে বিক্রি করা হয়। বিওসির পক্ষে ওয়ালী উর রহমান ভূঁইয়া (বর্তমানে মৃত) এনেম এক্সপ্রেসের মালিক নিও গ্যাব্রিয়েল মেন্ডেজ ও খায়রুল আলমের নামে জমিটি রেজিস্ট্রি করে দেন। সরকারি জমি জেনে খুলনা সদরের সাবরেজিস্ট্রার গৌর চন্দ্র দাস দলিল করেন। পরে তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বর্তমানে যুগ্ম সচিব সাখাওয়াত হোসেন এবং সাবেক ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান নামজারি করে দেন। তারা সরকারি জমি জেনেও বিক্রেতার নামে দলিল সম্পাদন ও নামজারি করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। এ কারণে এই পাঁচজনের বিরুদ্ধেই মামলা করা হয়েছে। গত ৮ মার্চ দায়ের করা মামলায় আসামিরা হলেন ধানম-ি জেনেটিক প্লাজার এনেম এক্সপ্রেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিও গ্যাব্রিয়েল মেন্ডেজ, চিফ অপারেটিং অফিসার খায়রুল আলম, খুলনা সদরের সাবেক সাবরেজিস্ট্রার গৌর চন্দ্র দাস, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান।

স্থানীয়রা বলেছেন, খুলনা লবণচরা এলাকায় প্রতি কাঠা জমির বর্তমান বাজারমূল্য স্থানভেদে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে ৪ দশমিক ৩৬ একর বা ২৬১ কাঠা জমির বাজারমূল্য ৭০ থেকে ৭৫ কোটি টাকা। ২০০৫ সালে ওই জমির আনুমানিক দাম ছিল ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা। অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশ করে সরকারি জমি বেশি দামে বিক্রি করে নিবন্ধনের সময় কম দাম দেখিয়ে বেশিরভাগ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এ ঘটনার তদন্তকালে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদেরও আসামি করা হবে বলে দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।