পরমাণু অস্ত্রের চেয়ে ভয়ংকর পানি!

নির্ঘুম রাতে সোফিয়ার মনে প্রায়ই আশঙ্কা জাগে একদিন হয়তো কল খুলে দেখবেন, তাতে আর পানি মিলছে না। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এ বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, ‘দিনশেষে আমরা তো মরুবাসীই। তেল-গ্যাস অর্থনীতির কেন্দ্রে থাকলেও পানি হলো আমাদের বেঁচে থাকার মূল রসদ।’ সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য, ইরান যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য যত অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে, সোফিয়ার আশঙ্কাটা ততই বাড়ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো ‘ডেসালিনেশন’ বা ‘লবণমুক্তকরণ’ পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এ পদ্ধতিতে সমুদ্রের পানিকে লবণমুক্ত করা হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনোভাবে এসব ডেসালিনেশন প্ল্যান্টে হামলা এলে ওই অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের দিকে হাত বাড়ানোর মতোই। এর রাজনৈতিক ও মানসিক ক্ষত এমন হবে, যা কল্পনা করাটাও কঠিন।

নিরাপত্তার কারণে প্রকৃত নাম প্রকাশ না করা এ নারী বলেন, ‘আমি যদি নিজেকে শত্রুর জায়গায় কল্পনা করি, তাহলে এই খাবার পানিকেই লক্ষ্যবস্তু বানাতাম। পানির অভাবে পড়তে পারি, এ কথা কখনো কল্পনাও করিনি।’

সিএনএনের একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোফিয়ার মতো মধ্যপ্রাচ্যের অনেকের মধ্যেই এ আশঙ্কা ঢুকে গেছে যে, যুদ্ধে তাদের জীবনধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রসদটি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

গত রবিবার বাহরাইনের কর্মকর্তারা দাবি করেন, ইরানের ড্রোন হামলায় তাদের একটি ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও এতে পানির সরবরাহ ব্যাহত হয়নি।

এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কেশম দ্বীপের একটি ডেসালিনেশন প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে ৩০টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ হামলাকে ‘বিপজ্জনক পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযোগ অস্বীকার করে।

পাল্টাপাল্টি এ অভিযোগ উপসাগরীয় অঞ্চলের শত শত ডেসালিনেশন প্ল্যান্টকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এসব প্ল্যান্ট থেকে ওই অঞ্চলের প্রায় ১০ কোটি মানুষকে খাবার পানি সরবরাহ করা হয়।

ইরান এখনো বেশিরভাগ খাবার পানি পায় নদী ও ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রাকৃতিক মিঠা পানির উৎস একেবারেই সীমিত। কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনের মতো কয়েকটি দেশ ‘ডেসালিনেশন’ পদ্ধতির পানি দিয়েই চলে।

ইউনিভার্সিটি অব ইউটার মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লো সিএনএনকে বলেন, এ ধরনের অবকাঠামোতে হামলা হলে তা হবে উত্তেজনা বৃদ্ধির ‘অকল্পনীয় মাত্রা’।

কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের জননীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লরাঁ ল্যাম্বার বলেন, ‘ডেসালিনেশন প্ল্যান্টে জেনেবুঝে হামলা চালালে তা শুধু যুদ্ধাপরাই নয়, সেটা যুদ্ধের উদ্বেগজনক অগ্রগতি হিসেবেও দেখতে হবে। কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে মাত্র কয়েক সপ্তাহের পানির মজুদ থাকে।

’যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু ও অস্ত্র যখন পানি : জরুরি বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) ‘পানি নিরাপত্তা’বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক ডেভিড মিশেল বলেন, ডেসালিনেশন প্ল্যান্টগুলোর ওপর পরিকল্পিত হামলা চালালে তা হবে উসকানি নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি করা।

ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনার নজির রয়েছে। ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাক ইচ্ছাকৃতভাবে পারস্য উপসাগরে কোটি কোটি ব্যারেল তেল ছেড়ে দেয়।

উপসাগরীয় অঞ্চলের ডেসালিনেশন প্ল্যান্টগুলো যে পানি ব্যবহার করত, এ তেলের কারণে তা দূষিত হয়ে পড়ে। তখন কুয়েতকে তুরস্ক ও সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশের সহায়তা নিতে হয়। এ সহায়তার অংশ হিসেবে শত শত পানিবাহী ট্যাংকার ও ট্রাক করে বোতলজাত পানি সরবরাহ করা হয়। মিশেল বলেন, গত এক দশকে পানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করার অনেক নজির দেখা গেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া দেশটির পানি অবকাঠামোর ওপর শতাধিক হামলা চালিয়েছে। একইভাবে ইসরায়েল গাজায় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধাগুলো ধ্বংস করেছে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মারওয়া দাউদি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা একটা প্রবণতায় রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু ও অস্ত্রের যে দীর্ঘ তালিকা, তাতে এখন পানিও যুক্ত হয়েছে।’

ইরান এখনো উপসাগরীয় অঞ্চলের ডেসালিনেশন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বিভিন্ন অবকাঠামোতে পাল্টাপাল্টি হামলার প্রবণতা দেখা দিলে ইরান সেই পথে হাঁটতেও পারে।

নাদের হাবিবি বলেন, ‘ইরানের শাসনব্যবস্থা দেখিয়েছে যে, টিকে থাকার স্বার্থে তারা অস্থিরতা বাড়াতে দ্বিধা করবে না, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী যদি তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় আঘাত হানে।’

ঝুঁকি আছে পরোক্ষ আঘাতের : শুধু সরাসরি হামলাই নয়, ডেসালিনেশন প্ল্যান্টগুলো পরোক্ষ আঘাতের ঝুঁকিতেও আছে। কারণ, এসব স্থাপনার বেশিরভাগই বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর পাশে অবস্থিত। ফলে এসব স্থাপনায় হামলা হলে ডেসালিনেশন প্ল্যান্টগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চলতি মাসের শুরুর দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ফুজাইরাহ এফওয়ান ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট’ এবং কুয়েতের ‘দোহা ওয়েস্ট প্ল্যান্ট’ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর সামনে আসে। ধারণা করা হচ্ছে, আশপাশের অবকাঠামোর ওপর হামলার পরোক্ষ প্রভাবে এসব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রে বড় সাইবার হামলার আশঙ্কাও রয়েছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, ইরান তাদের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের পানি অবকাঠামোতে সাইবার হামলা চালিয়েছে। যুকারাষ্ট্র সরকারের ভাষ্য, হামলার পর একটি বার্তা ভেসে ওঠে, যেখানে লেখা ‘তোমাদের হ্যাক করা হয়েছে, ইসরায়েলের পতন হোক’।

ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে বিপর্যয় নেমে আসবে, তেমনটা অবশ্য নয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে পানির মজুদ রয়েছে এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্যও তাদের আছে। তবে রিয়াদ, আবুধাবি ও দুবাইয়ের মতো শহরের বড় অংশে পানি সরবরাহকারী বিশাল প্ল্যান্টগুলোতে হামলা হলে তার প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।

সিএসআইএসের গ্লোবাল ফুড অ্যান্ড ওয়াটার সিকিউরিটি প্রোগ্রামের উপপরিচালক জেইন সোয়ানসন বলেন, ‘এসব প্ল্যান্ট অচল হয়ে পড়লে তা অস্তিত্বগত সংকটে পরিণত হতে পারে।’ কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট অত্যাধুনিক ও জটিল স্থাপনা। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুনরায় চালু করতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।

ব্র্যান্ডাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের নাদের হাবিবি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে সংকট সামাল দেওয়ার মতো বিকল্প সক্ষমতা কিছু দেশের কম। এ ক্ষেত্রে বাহরাইন ও কুয়েত বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ, এসব দেশ ভৌগোলিকভাবে ছোট, সম্পদ সীমিত এবং তাদের খাবার পানির প্রায় ১০০ শতাংশই ডেসালিনেশন পদ্ধতি থেকে আসে।

লরাঁ ল্যাম্বার বলেন, এর প্রভাব নানাভাবে সামনে আসতে পারে। সুইমিং পুল ও ওয়াটার পার্কে বিধিনিষেধ আরোপ হতে পারে। নির্দিষ্ট কৃষিকাজসহ পানিনির্ভর অর্থনৈতিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমনকি জনগণকে পানি ব্যবহার কমানোর আহ্বান পর্যন্ত আসতে পারে এসব দেশে।

অনেকটা পারমাণবিক অস্ত্রের মতোই : খাবার পানি নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর ঝুঁকির বিষয়টি এর আগেও সামনে এসেছে। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা-সিআইএ তাদের একটি প্রতিবেদনের উপসংহার টেনেছিল এই বলে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে ডেসালিনেশন প্রক্রিয়ায় বিঘœ ঘটলে তার পরিণতি হবে অন্য যেকোনো শিল্প বা পণ্যের ক্ষতির চেয়ে ভয়াবহ।

লো মনে করেন, চলমান যুদ্ধ হয়তো উদ্বেগের একটা বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনও এই উদ্বেগকে আবার সামনে এনে দাঁড় করাবে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘন ঘন ও তীব্র ঝড়সহ বিরূপ আবহাওয়া দেখা দিচ্ছে, যা ডেসালিনেশন প্ল্যান্টগুলোর ক্ষতি করতে পারে। এ ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে পানি উৎপাদন করাটাও জলবায়ু সংকটকে আরও উসকে দিচ্ছে। লোর ভাষায়, ‘ডেসালিনেশন হলো বিংশ শতাব্দীর একটা বিজয়, যা একবিংশ শতাব্দীতে জলবায়ু পরিবর্তনে বিষয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন হাজির করেছে।’

উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো এখন বছরের সবচেয়ে উষ্ণ সময়ের দিকে এগোচ্ছে।

সোয়ানসন বলেন, ‘সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, এসব অবকাঠামোর ঝুঁকি যত বাড়বে, পানিসম্পদের ওপর চাপ তত বাড়বে।’

ইরান কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি শেষমেশ ডেসালিনেশন প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েই বসে, তবে সেটি হবে একটি স্পষ্ট ‘লাল রেখা’ অতিক্রম করার সমতুল্য।

লোর মতে, এমন পদক্ষেপ নেওয়াটা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের দিকে হাত বাড়ানোর মতোই। তিনি বলেন, এটা হবে অস্বাভাবিক একটা কৌশল। এর রাজনৈতিক ও মানসিক ক্ষত এমন হবে, যা কল্পনা করাটাও কঠিন।