জাতীয় জীবনে মার্চ মাস নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসের ২৬ তারিখে বাংলাদেশ নামের দেশটির জন্ম হয়েছে। তবে এই ভূখ-ের ইতিহাস সুপ্রাচীন। সমুদ্রের তলদেশ থেকে উঠে আসা এই ব-দ্বীপটি ভারতীয় উপমহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ভূ-খ- নানা সময় বিদেশি শক্তি দ্বারা শাসিত হলেও শৃঙ্খলের জিঞ্জির ছিন্ন করে বারবার স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এভাবেই এ অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনচেতা মানুষ হিসেবে পরিচিত হয়েছে ভারত উপমহাদেশে এবং বিশ্ব জুড়ে। শুধু শক্তি প্রয়োগ করেই নয়, মানসিকভাবেও হীনম্মন্য করে রাখার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে নানাভাবে। তার মধ্য একটি কৌশল হলো, এটা প্রচার করা, বাংলাদেশ বা এই বঙ্গভূমি আগে কখনো স্বাধীন ছিল না। ভাষাসংগ্রামী, সাহিত্য সমালোচক ও ইতিহাসবিদ আহমদ রফিক লিখিত প্রতিবাদ করেছেন এই প্রোপাগান্ডার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে উপজীব্য করে কিশোরদের জন্য লিখিত ‘ছোটদের মুক্তিযুদ্ধের কথা’ বইয়ে তিনি বলেছেন, এমন একটি কথা হয়ে থাকে যে, এই বাংলাদেশ অঞ্চল অর্থাৎ বঙ্গদেশ একাত্তরের আগে কখনো স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। এ তথ্য পুরোপুরি ঠিক নয়। একাধিক সময়ে বা রাজশাসনে স্বাধীন বাংলা অঞ্চলের কথা জানা যায়। বাঙালির আদি ইতিহাস রচয়িতা ড. নীহাররঞ্জন রায় ইতিহাসের অনেক সূত্র ধরে লিখেছেন, এ অঞ্চলে ‘গঙ্গারাষ্ট্র’ বা ‘গঙ্গাহৃদি’ নামে একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ...রাজা শশাংক থেকে পাল বংশ ও সেনবংশের রাজত্বকালেও গৌড়বঙ্গ ছিল স্বাধীন রাজ্য। এমনকি সুলতানী আমলে। তখন এর সুস্পষ্ট নাম ছিল শাহী বাঙ্গালা।’
একজন আত্মমর্যাদাবান নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য শিশু-কিশোরের নিজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক। কিন্তু নানা প্রোপাগান্ডার জন্য তাদের কাছে প্রকৃত ইতিহাস পৌঁছতে পারে না। তাদের কাছে প্রকৃত ইতিহাস পৌঁছে দিতে আমৃত্যু অক্লান্তভাবে গবেষণায় ও লেখনীতে নিমগ্ন ছিলেন লেখক, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক। বাংলাদেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধকে ছোটদের উপযোগী করে পরিবেশন করেছেন তার ‘ছোটদের মুক্তিযুদ্ধের কথা’ বইতে। তিনি এই বইয়ে শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, সংক্ষিপ্ত পরিসরে সমগ্র স্বাধীনতা-সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন। এ অঞ্চলের শেষ স্বাধীন নবাব, সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলা প্রায় দুইশ বছরের পরাধীনতা বরণ করে। তবে বাঙালি সহজে এই পরাজয় মেনে নেয়নি। তারা ক্রমাগত ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম ও সশস্ত্র বিদ্রোহ চালিয়ে গেছে। ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, সিপাহি বিদ্রোহ এ সময়কালের ইংরেজদের ভিত নাড়িয়ে কিছু বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহে অতিষ্ঠ হয়ে ইংরেজরা বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করার পরিকল্পনা করে। তাদের এই প্রকল্প গ্রহণের কারণ হিসেবে প্রশাসনিক কিছু সুবিধার কথা বলা হলেও মূলত বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল মুখ্য। এর ফলে পূর্ব বাংলা ও আসামকে নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু বাংলাকে ভাগ না করে সেসব সুবিধা দেওয়া যেত না এমন নয়। বঙ্গভঙ্গ এই প্রকল্পের নাম। তীব্র আন্দোলনের মুখে বঙ্গভঙ্গ বাতিল করতে বাধ্য হয় ইংরেজ শাসক। তবে ইংরেজদের পরিকল্পনা নানাভাবে ঠিকই বাস্তবায়িত হয়। ধর্মীয়ভাবে উদার এ দেশের মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে দুভাগে ভাগ করতে তারা সক্ষম হয়। ইংরেজ শাসকরা ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দিতে সম্মত হয়। কিন্তু ভারতবর্ষ ধর্মের ভিত্তিতে দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। ভারত ও পাকিস্তান। পূর্ববঙ্গে মুসলমান সংখ্যাধিক্য থাকায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু পূর্ববঙ্গের মানুষ খুব অল্পসময়ের মধ্যেই বুঝতে পারে তারা শোষণের শিকার হচ্ছে। স্বাধীনচেতা এ মাটির সন্তানরা আবার তাদের অধিকারের জন্য লড়াই শুরু করে। তারা প্রথম সংগঠিত হয় ভাষা আন্দোলনে। এজন্য ভাষা আন্দোলনকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার বলা হয়। এই আন্দোলনের একজন সংগঠক ছিলেন আহমদ রফিক। ফলে ভাষা আন্দোলন ও তার পরের আন্দোলন-সংগ্রামগুলোতে তিনি নিজে অংশ নিয়েছেন এবং সাক্ষী হয়েছেন ইতিহাসের। এ দেশের মানুষ নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছিল। কিন্তু তাদের ক্ষমতা গ্রহণ থেকে বিরত রাখতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শুরু করে গণহত্যা। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরাজয়বরণ করে। বিজয় হয় বাংলাদেশের। আহমদ রফিক তার ছোটদের মুক্তিযুদ্ধের কথা বইতে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের এই ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। বইটি পড়লে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তোমাদের ধারণা স্পষ্ট হবে, বুঝতে পারবে কীভাবে আমরা বাংলাদেশ পেলাম।
সুলতানা রাজিয়া