হৃদ্যিক সম্পর্কের জটিল মনস্তত্ত্ব

সম্প্রতি ছোট পর্দার একজন অভিনেতার স্ত্রীর আত্মহত্যা, সাধারণ মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। জীবনে একবার জন্ম, পরিণতিতে মৃত্যু। কিন্তু প্রেম বা বিয়ে বারবার করার সুযোগ রয়েছে। যদিও বিষয়টি যার যার অভিরুচি। জীবনের চেয়ে মূল্যবান ‘জীবন’ ছাড়া কিছু নেই। কিন্তু  নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে যখন আত্মহনন হয়, তখন কাজ করে কঠিন মনস্তত্ত্ব। আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, নারী-পুরুষের পারস্পরিক হৃদ্যিক সম্পর্ক দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে আসে। এটা স্বীকার করতে হবে, দাম্পত্য সম্পর্কে অস্থিরতা বাড়ছে। ফলে ‘পরকীয়া’ শব্দটি আজকাল অহরহ শোনা যায়। আমাদের শৈশব, কৈশোরে সমাজে ‘পরকীয়া’র বিস্তার  ছিল না। কদাচিৎ এমন ঘটনা শুনলেও, ওই ব্যক্তিকে সবাই  ঘৃণার চোখে দেখতেন। কিন্তু বর্তমানে বিষয়টি অনেকটা মহামারীর আকার নিয়েছে। সময় এসেছে, সন্তানকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষিত করার বিশেষ করে, ভার্চুয়াল জগতে কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিশেষ করে, স্বামী-স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক আস্থা থাকা জরুরি। মূলত, আস্থাহীনতাই এই অবৈধ সম্পর্কের জন্য দায়ী। এ জন্য স্বামী বা স্ত্রী কাউকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না। এর কারণ হচ্ছে, আমার সমস্যা এবং মানসিক জটিলতা আমি ছাড়া কেউ ভালো জানবে না। ফলে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া দুষ্কর। কোনটা পরকীয়া, কোনটা বন্ধুত্ব আর কোনটা স্রেফ পরিচিত বা পরিচিতার সঙ্গে ভদ্র আচরণ, সে বিষয়ে উভয় পক্ষের স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। প্রশ্ন উঠতেই পারে, মার্জিত শিক্ষা এবং বলিষ্ঠ মন মানসিকতা নিয়ে।

সংসার জীবনে মন যা চায়, আমি তাই করতে পারি না, অথবা করা উচিত নয়। শুনতে খারাপ লাগলেও বলতে হয়, অধিকাংশ মানুষের মন ‘অসামাজিকতা’ পছন্দ করে। মনে মনে অনেক কিছুই করা যায়। মন চাইলে, পকেটে টাকা না থাকুক, চোখ বন্ধ করে বুর্জ আল খলিফার প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে শুয়ে সোনার কাপে কফি খেতে খেতে, আরব সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এখানেই প্রশ্ন আসে অর্জিত শিক্ষা, পারিবারিক শিক্ষা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের বিষয়টি। মানুষ চাইলেই স্বার্থপর হতে পারে না। নিজের কুপ্রবৃত্তি, নোংরা ইচ্ছার লাগাম টেনে ধরতে হয়। সামাজিক রীতি মাথায় রাখতে হয়। বোধে থাকতে হয় আমি শুধু আমি না, তার সঙ্গে রয়েছে অর্জিত শিক্ষা, নিজেকে সভ্য এবং  রুচিশীল হিসেবে গড়ে তোলা এবং আমার পরিবার। মিডিয়ার মানুষের ব্যক্তিগত জীবন কখনো আলোচনার বিষয় মনে হয়নি। আসলে অভিনয় মানে কী? অভিনয় করতে গেলে যদি সহ-অভিনেতার সংস্পর্শে নিজের ভেতর শারীরিক বা মানসিক পরিবর্তন আসে, তাহলে কোনোভাবেই তা অভিনয় নয়। তবু পান্ডুলিপি এবং চরিত্রের প্রয়োজনে ঘনিষ্ঠতার দৃশ্য থাকতেই পারে। এটিকে স্বাভাবিকভাবে দেখতে হবে। শুধু অভিনেতা-অভিনেত্রী কেন, সব মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। মিডিয়া অনেক বড় ব্যাপার, আজকাল সোশ্যাল মিডিয়াতে নারী, পুরুষকে বা পুরুষ, নারীকে ইতিবাচক কমেন্ট করলে, একসঙ্গে কোনো অনুষ্ঠানে দেখলে ওই সম্পর্কেও অনেক মানুষ তাদের ওপর আঙুল তুলে। এটা হীনমন্যতা। আসলে প্রকৃত শিক্ষা এবং পারিবারিক মূল্যবোধ এখানে ভীষণ প্রভাব ফেলে। 

দীর্ঘদিনের তীব্র মানসিক অস্থিরতার জেরে, ‘ইকরা’ মেয়েটি আত্মহত্যা করল। শুধু ইকরার আত্মহত্যা কেন, যে কোনো আত্মহত্যাই মহাপাপ। জীবনে ভীষণ ভাবে হেরে যাওয়া। মনে রাখা দরকার, স্রষ্টা আমাদের হাতে ফুলের বিছানা বানিয়ে তুলে দেননি।  জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে পরিশ্রম করে ফুলের মতো তৈরি করতে হয়। প্রতিনিয়ত নারীকে লড়াই করতে হয় বিভিন্ন মানসিক অনুভূতি এবং নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে। কিন্তু কোনোভাবেই মনকে ড্রাইভিং সিটে বসতে দেওয়া যাবে না। মন নিয়ন্ত্রণ করাই আমার শিক্ষা এবং বোধ। ফলে নিজেকে অটো সাজেশন এবং শক্ত করার বিকল্প নেই। আত্মহত্যা করার পথ থেকে ফিরে আসা অনেকের মুখে শুনেছি, সেদিন যদি আত্মহত্যা করতাম তাহলে কি আজ এই সফলতা দেখতাম? আজকের এই সুন্দর মুহূর্ত, উপভোগ করতে পারতাম! আমরা যেন ভুলে না যাই, জীবনটা স্রষ্টার দেওয়া উপহার। সেটা স্বেচ্ছায় বিনাশের অধিকার আমাদের কারও নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জীবন মানেই বোঝা। তাকে বহন করে নিয়ে যেতে হয়। সেখানে যেমন দুঃখ থাকে, তেমনি আনন্দও থাকে। কথাটি যেন আমরা না ভুলি। জীবন কারও জন্য থেমে থাকে না। প্রত্যাশার চাপ কমিয়ে, লড়াই করে যেতে হবে। নিজেকে সুন্দর রাখতে হবে। ভিন্ন সমস্যা হলে, জীবন সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন। সমস্যার সমাধান না হলে সরে আসুন। নিজের মতো থাকুন, নিজেকে আনন্দে রাখুন। জীবনকে উপভোগ করুন। অনেক কিছু করার আছে এ জীবনে।

চূড়ান্ত অর্থে, কোনো সম্পর্ক স্বার্থের বাইরে নয়। পৃথিবীতে সবকিছু আবর্তিত হচ্ছে, কোনো না কোনো স্বার্থকে কেন্দ্র করে। সবাই সবার ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে ব্যক্তিগত যা কিছু রয়েছে, তাকে মুক্ত দৃষ্টিতে দেখতে হবে। আমরা যেন ভুলে না যাই, দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে সামাজিক রীতিনীতি। বাংলাদেশে যে আচরণ দৃষ্টিকটু, অন্য দেশে সেটা স্বাভাবিক। অন্য দেশ কেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষকে গহিন অরণ্যে একবার দেখে আসুন। দেখবেন, তারা কীভাবে স্বামী-সন্তান, বন্ধুবান্ধব নিয়ে খোলামেলাভাবে জীবনযাপন করছে। মূল কথা হচ্ছে, পরিবেশ এবং শিক্ষা। এই বাস্তবতাই একজন মানুষকে আমার কাছে ভালো বা মন্দ হিসেবে উপস্থাপন করে। সুতরাং, মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ‘আত্মহত্যা’ সমাধান হতে পারে না। প্রয়োজনে দূরে চলে আসুন। নিজেকে মুক্ত করুন। একবার ভাবুন, আপনার অনুপস্থিতিতে এই পৃথিবীর কিছুই আসে যায় না। শুধু পরিবারের আপনজন কিছুদিন মনে রাখবে। তারাও একসময় ভুলে যাবে। অনন্ত সময় পর, আপনি হারিয়ে যাবেন কালের গহ্বরে। আত্মহনন বাদ দিয়ে আপনি যদি দৃঢ় মানসিকতা গড়ে তুলতে পারেন তাহলে জীবনে পরাজয় থাকবে বহুদূর। বাস্তবতার আলোয় জীবনকে দেখুন, স্বপ্নের মতো নয়। 

লেখক : কম্পিউটারবিজ্ঞানী এবং লেখক

jahansharmin962@gmail.com