ঢালাও মৃত্যুদণ্ড

অবিচার নয়, চাই ন্যায়বিচার 

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১০ এএম

দাসপ্রথা-বিরোধী, নারীবাদী, অধিকারকর্মী, ঔপন্যাসিক, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবাদী সাংবাদিক লিডিয়া মারিয়া চাইল্ড বলেছেন, ‘আইন এবং বিচার কখনোই যথার্থ নয়, যদি তা শাশ্বত ন্যায়বিচারের মূলনীতিকে লঙ্ঘন করে’। তার উক্তিটি আমাদের দেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় সামনে আসে। দেশের বিচারিক বা নিম্ন আদালতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কিংবা ফাঁসির রায় নিয়ে আলোচনার বিষয়টি নতুন নয়। কিন্তু এত আলোচনা-সমালোচনা এমনকি এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের রায়ের পরও এ ক্ষেত্রে যে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি এর সাক্ষ্য মিলেছে ৬ আগস্ট দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে। দেশ রূপান্তরের তরফে কিছু কেসস্টাডি পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে প্রায় ৭৪ শতাংশ ফাঁসির রায়ই হাইকোর্টে এসে টিকছে না। এই বিষয়টি একদিকে প্রশ্নবোধক অন্যদিকে ন্যায়বিচারের অন্তরায়। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা, একজন ফৌজদারি আইন বিশ্লেষক, একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বর্তমানে কর্মরত ও অবসরে যাওয়া দুজন জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ, হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের রাষ্ট্রপক্ষের দুজন আইনজীবীর অভিমত বিশ্লেষণে প্রতীয়মান বিচারিক আদালতের কিছু বিচারকের মধ্যে ব্যাপকহারে প্রাণদণ্ড দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।

বিচারকের ব্যক্তিগত ইচ্ছা কিংবা প্রবণতা আইনের স্বাভাবিক গতির পথে প্রতিবন্ধক তো বটেই, মানবাধিকারেরও লঙ্ঘন। মানুষের আশ্রয়-ভরসার অন্তিম স্থল আদালত। কিন্তু সেখানে যদি ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে অবিচারের ছায়া প্রলম্বিত হয় তাহলে এর বহুমাত্রিক নেতিবাচকতা সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য শুধু যে কলঙ্কের পরিসরই বিস্তৃতির শঙ্কা প্রকট করে তুলে তা-ই নয়, একই সঙ্গে তা ন্যায় ছাড়া আইন ও প্রতিকার ছাড়া ক্ষত তৈরির পথও সুগম করে। যে কোনো মানবিক সমাজে নিশ্চয় এমনটি পরিতাজ্য। সাধারণত বিচারহীনতা, রায়ের ক্ষেত্রে অপপ্রবণতার প্রতিফলন বা ভুল রায়ের বিষয়ে  মানুষের আক্ষেপ প্রকাশ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ তার প্রশ্ন কবিতার একাংশে বলেছেন, ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’। এই বাক্যবন্ধটি আমাদের সমাজে প্রচলিত লোককথায়ও পরিণত হয়েছে। আমরা জানি, সঠিক সময়ে ও নির্ভুল-নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার না পেলে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের জনচাপও কিছু বিচারকের প্রবণতার পেছনে ভূমিকা রাখছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বিষয়। বিচারিক আদালতের প্রদেয় দণ্ড  হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে যাওয়ার পর গভীর পর্যবেক্ষণ, নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে উচ্চআদালতের পূর্ববর্তী নজিরসহ অনেক কিছু বিবেচনায় নেওয়া হয়।

আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই ইতিপূর্বে বলেছি, আইনের শাসনের পরিপন্থী কোনো কিছু গ্রাহ্য করা যায় না, তা সমীচীনও নয়। একটি মিথ্যা অভিযোগের প্রভাব একজন নির্দোষ মানুষকে তিলে তিলে কীভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে এর অনেক নজিরই আমাদের সামনে আছে। আমরা মনে করি এবং একই সঙ্গে স্থির বিশ্বাসও পোষণ করি, বিচারক পদটি একটি বিশেষ অধিকার বা সম্মান, যা অনেক শর্ত, দায়িত্ব ও জবাবদিহির ভারে আবদ্ধ। কিন্তু আমাদের বিচারিক বা নিম্ন আদালতে দেওয়া রায়ের বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড কিংবা ফাঁসির রায় নিয়ে যে বার্তা মিলেছে তা অপ্রীতিকর তো বটেই, চরম উদ্বেগেরও। আদালতের কাজ কেবল মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা নয়, বরং ন্যায়বিচারের সঙ্গে সঠিক সিদ্ধান্ত প্রদান করা। আমরা দুষ্কর্মের শাস্তি চাই কিন্তু এমন শাস্তি কামনা করি না যা সংঘটিত অপরাধের তুলনায় একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্বের অনেক  সমাজেই ‘সিংহের কেশর দেখতে পেলে পুরো সিংহটিকে দেখার প্রয়োজন হয় না’ এই প্রবাদটি বহুল প্রচলিত। আমরা মনে করি, ভুল কিংবা অপপ্রবণতার দোষে অভিযুক্ত  একটি রায় সংগত-অসংগতের মধ্যে শুধু বিভাজনের দাগটিই মোটা করে না, অধিকারের স্তম্ভও গুঁড়িয়ে দেয়। এমনটি তো কাম্য হতে পারে না।

 বিচারের মানদণ্ড প্রশ্নমুক্ত করার দায়দায়িত্ব যাদের তাদের দৃষ্টি নির্মোহ তো অবশ্যই, প্রতিটি কাজ হতে হবে অনুসরণযোগ্যও। ন্যায়বিচারের আলোয় দেশ-সমাজ আলোকিত হয় আর অবিচারের ছায়ায় ন্যায্যতা অন্ধকারে তলিয়ে যায়। আমরা আশা করব, বিচারিক বা নিম্ন আদালত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি আমলে নেবেন। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের জনপ্রত্যাশা পরিপুষ্ট হোক। কেউ যেন শিকার না হন অবিচারের।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত