সোলার সম্প্রসারণে বাধা

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১১ এএম

আমরা যখন আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি, তখন নবায়নযোগ্য জ¦ালানি প্রসারের কথা বলছি। জীবাশ্ম জ্বালানি কয়লাকে এড়াতে চাইলেও, এলএনজিকে স্বাগত জানাচ্ছি। জ্বালানি খাতে রূপান্তরের বিষয়টি আমরা নবায়নযোগ্যমুখী করতে পারছি না। ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দেশে বছরে প্রায় ২১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা (প্রায় ৯৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গত বছর আমরা মাত্র ২৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে পেরেছি। অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জনে এর চেয়ে চার-পাঁচগুণ বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা এবং প্রকৌশলগত মহাপরিকল্পনার মধ্যে একটি বড় ধরনের ফারাক তৈরি হয়েছে। ‘ন্যাশনাল ক্লাইমেট প্রোসপারিটি প্ল্যান’-এ বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি ভবিষ্যতের কথা বলা হয়েছে, সেখানে সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (আইইপিএমপি) পারমাণবিক ও কার্বন-ক্যাপচার প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করে ‘পরিচ্ছন্ন জ্বালানি’র সংজ্ঞাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং সৌর ও বায়ুর মতো প্রচলিত নবায়নযোগ্য উৎসগুলোকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র বৃহৎ আকারের ইউটিলিটি পার্কগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা প্রয়োজনীয় জমি জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে রুফটপ সোলার সম্প্রসারিত হওয়ার আকাক্সক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কারণে এগোতে পারছে না। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে, জলবায়ু সংক্রান্ত বিষয়গুলো কাক্সিক্ষত ফল অর্জন করতে পারবে না। এজন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার সংযোগ ঘটাতে হবে। প্রযুক্তিগত তত্ত্বাবধানের অভাবে বিদ্যমান হোম সোলার ইনস্টলেশনগুলোর ৪৭ শতাংশ পরিচালনগত ব্যর্থতার মুখে পড়েছে, যা ঋণদাতাদের নিরুৎসাহিত করছে। তারা এই প্রযুক্তিকে একটি রাজস্ব-উৎপাদনকারী সম্পদের পরিবর্তে একটি দায় হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দীর্ঘ পরিশোধের মেয়াদসহ দীর্ঘমেয়াদি মূলধন প্রয়োজন। অন্যদিকে ব্যাংকের কাছে একজন সাধারণ ঋণগ্রহীতার একটি গ্রিনফিল্ড সৌর প্রকল্প মূল্যায়ন করার চেয়ে, কারখানার উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন বয়লারে অর্থায়ন করা কাঠামোগতভাবে বেশি সহজ। বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন নীতিকাঠামো ব্যক্তি তথা পরিবার পর্যায়ে ঋণ দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু এর বর্তমান ‘পুনঃঅর্থায়ন’ মডেল পরিবার পর্যায়ে তারল্য সঞ্চালন করতে পারছে না। এই মডেলের অধীনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে আবেদন করার আগেই, আবেদনকারীকে নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করে প্রাথমিক ঝুঁকির একশ শতাংশ বহন করতে হয় যা মূলধন প্রবাহের গতি কমিয়ে দেয় এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণদানে নিরুৎসাহিত করে। এই ‘অর্থায়ন-পরবর্তী’ নিয়মটি প্রকৃতপক্ষে পারিবারিক পর্যায়ের আবেদনকারীর অর্থ প্রয়োজনের সময় তার পাশে না দাঁড়ানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে সুযোগ করে দিচ্ছে। আবার বর্তমান পুনঃঅর্থায়ন পুলটি প্রতিটি প্রকল্পের জন্য সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকার ঋণসীমা নির্ধারণ করে রেখেছে, যা বড় পরিসরের জন্য বেশ কম। কিন্তু ব্যক্তিগত পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য অনেক বেশি। অবশ্য পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীকে আরও শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র, যা ঝক্কির। গৃহস্থালি উদ্যোক্তার জ্বালানি খাতকে নিরাপদ করতে চাইলে, ব্যাংকিং খাতকে সম্পত্তিভিত্তিক ঋণদান পদ্ধতির পরিবর্তে কর্মসম্পাদনভিত্তিক ঋণদান পদ্ধতিতে যেতে হবে, যাতে জামানতের দেয়াল উঠে যায়।

জলবায়ু-সম্পর্কিত কিস্তিতে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড় করাতে সরকার জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি অপসারণ করার লক্ষ্যে, খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য ১৬.৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। এতে বাণিজ্যিক বিদ্যুতের দর ইউনিটপ্রতি ১১ দশমিক ৫৬ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে রুফটপ সোলার থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ইউনিটপ্রতি মাত্র সাড়ে তিন টাকা হতে চার টাকা। এই ‘শুল্ক ব্যবধান’ ব্যক্তি তথা পারিবারিক পর্যায়ে সৌরশক্তির প্রতি আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী করে তুলেছে। পরিবারগুলোকে বিদ্যুতে ক্ষমতায়িত করার জন্য সরকার বিকেন্দ্রীভূত পরিবার-চালিত মডেল গ্রহণ করতে পারে। ব্যক্তি পর্যায়ে সোলার উপকরণের ওপর আমদানি শুল্ক শূন্য করতে হবে। আবাসিক প্যানেলের ওপর মোট আমদানি শুল্ক, ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। এতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হবে।  পারিবারিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে পাঁচটি নীতিগত সহায়তা গ্রহণ করা জরুরি। ১. বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক একটি তহবিল গঠন করা; যা ব্যাংকের ক্ষতি পোষাতে সহায়তা করবে এবং জমির জামানতের প্রয়োজনীয়তা দূরীভূত হবে। ২.  সোলার উপকরণ বিক্রেতাদের কাছে অবিলম্বে অর্থ বিতরণ নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে অগ্রিম মূলধন বরাদ্দ করা। ৩. ব্যাংকগুলোকে ঋণ পরিশোধ করার জন্য সরাসরি ইউটিলিটি বিলের সঙ্গে সংযুক্ত করার অনুমতি দেওয়া, যাতে সোলার থেকে সাশ্রয় হওয়া অর্থ দিয়ে ঋণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিশোধ করা যায়। ৪. বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রশাসনিক খরচ কমাতে শত শত ছোট রুফটপ সিস্টেমকে একটি একক, ব্যাংকযোগ্য পোর্টফোলিওতে প্যাকেজ করার বৈধতা দেওয়া এবং ৫. আবাসিক ব্যবহারকারীদের প্রাথমিক মূলধনের বোঝা কমাতে এবং উচ্চ আমদানি শুল্ক জরিমানার প্রভাব কমাতে প্রতি কিলোওয়াট ২৫ হাজার টাকা হিসেবে সর্বোচ্চ ৩ কিলোওয়াট পর্যন্ত ৭৫ হাজার টাকা রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি বাস্তবায়ন করা। যাতে আবাসিক গ্রাহক উৎসাহিত হতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো ছাড়া আমরা জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হবো। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবশ্যই প্রযুক্তিগত ও আর্থিক নীতিমালা/নির্দেশিকা আধুনিক ও সময়োপযোগী করতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি খাতকে রাষ্ট্র-পরিচালিত একচেটিয়া ব্যবস্থা থেকে একটি বিকেন্দ্রীভূত জন-চালিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়তে হবে।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত